Categories
অন্যান্য এলজিবিটি ধর্মীয় ভাবনা বাংলাদেশ

Unseen Wounds always left Uncured

বয়স আমার যখন ১০ কি ১১, আর বাসায় হুজুর পড়াতে আসতেন, হাজার বার বলেও মাকে বোঝাতে পারতাম না হুজুরের কি আচরণ ছিল, সব কিছু ভাষায় প্রকাশ ও করতে পারতাম না, রাগে দুঃখে গলা ভারি হয়ে একসময় গলার আওয়াজ রুদ্ধ হয়ে যেত।
আসলে আমার কোনো কথা অনেক আগে থেকেই বিশ্বাস করতেন না, কারণ আমি যে কাউকে নিয়েই এ জাতীয় কথা বলতে থাকতাম। বাসায় বেড়াতে আশা আত্মীয়দের নিয়ে, গৃহশিক্ষক নিয়ে, ডাক্তার নিয়ে, স্কুল টিচারদের নিয়ে,কাজের লোক নিয়ে – উফ্ফ !!! অনেক যন্ত্রনা দিয়েছি।

সেই সময়টিতে মোবাইল ফোন ছিল না, ভিডিও করার কোনো সুযোগ ও ছিল না। আমার ধার্মিক নামাজী বর্তমানে হাজী মা কখনো হুজুরের মতো সম্মানিত ব্যাক্তি নিয়ে অশোভন এবং অসম্মানজনক কিছু শুনতেই চাইতেন না। হুজুর কেন খারাপ হবে, আমি ই পড়ালেখায় ফাঁকি দিতে চাইছি বলে আমার মায়ের চোখে আল্লা রাসূলের পাঠ পড়ানো পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি কে নিয়ে তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। আমার মতো নিকৃষ্ট সন্তান হতে পারে না। আমি তো হুজুর আসলে লুকিয়ে যাবোই, কিছুতেই পড়বো না তার কাছে। একসময় মা বিরক্ত হয়ে এই হুজুর বাদ দিয়ে নতুন হুজুর নিয়ে আসতেন।

প্রতিটি নতুন হুজুরের শুরুটা এমন থাকতো – আলিফ বা তা সা – না, আলিফ বে তে সে হবে। আগের হুজুর যা শিখিয়েছে সব ভুল শিখিয়েছে। এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই হুজুরের ও একই রকম আচরণ, জ্বর দেখার নাম করে গলায় আর ঘাড় হাতানো, সেদিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে স্তনে আঙ্গুল দিয়ে জোরে চেপে দেয়া, এমন ভাবে যে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাথায় চোখ দিয়ে পানি পরে যেত। সাথে সাথে হুজুর আমার মাথায় পিঠে মমতার হাত বুলাতো । দিনের পর দিন বিষন্ন চুপচাপ , রাতের পর রাত মুখ চেপে কান্না। এর সবই কারণ হুজুর আসলে আমি একটি লক্ষি মেয়ের মতো পড়তে না বসার জন্যে। এসব দেখলে তো আমাকে কোরান আর ইসলাম শিক্ষা দেয়া যাবে না। বহুবার মাকে বলেছি মা তুমি পর্দার আড়ালে একবার দাঁড়িয়ে দেখো হুজুর কিভাবে ব্যথা দেয়া আমাকে। বহুদিন পর্যন্ত মা মাথায় হাত বুলানো আর চোখে পানি দেখেছে, এর আগে কি হয়েছে তা দেখেনি। মাসের পর মাস গড়ানোর পর একদিন আমার ভাগ্য প্রসন্ন হলো, মা হাত বুলানোর আগের সিন্ নিজের চোখে দেখলো।
তারপর মা এই হুজুরের কাছে আমাকে পোড়ানো বন্ধ করে দিলো কিন্তু আমার ছোট ভাই কে সেই একই হুজুর কে দিয়ে পড়ানো অব্যাহত রাখলো।

Categories
এলজিবিটি বাংলাদেশ

শুভ অপরাহ্ন

বহুদিন হয়ে গেলো আমার সাইট টিতে তেমন লিখা আপলোড করিনি।
বহু কিছু ঘটে গেলো, কত প্রোটেস্ট, কত আলোচনা , সমালোনা , সেই সঙ্গে মানুষ চিনা।

এক এক করে আবার ও সব লিখতে শুরু করবো।

Categories
LGBT NEWS NEWS অন্যান্য এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ সমকামীদের অধিকার

How many people in the UK are gay, lesbian or bisexual?

The Office for National Statistics reckons it’s 1.5% while the Kinsey report says it’s 10%. Who’s right?

For every 100 people in Britain, just 1 will identify themselves as gay or lesbian according to the latest government statistics. The numbers (which include gender, location and age) may come as a surprise – but why?

1.5% of the UK?

In its ‘Integrated Household Survey’, the Office for National Statistics asks 178,197 people about their sexual identity – and the vast majority of them choose to answer.

93.5% of people said they were ‘heterosexual’ or ‘straight’, just 1.1% said they were ‘gay’ or ‘lesbian’ and 0.4% said they were bisexual. The small fraction that was left either refused to answer or said they didn’t know. Altogether, amounts to about 545,000 homosexual and 220,000 bisexual adults in the UK.

The claim that just 1.5% of people in Britain are gay, lesbian or bisexual will come as a surprise to some – even perhaps those in government. When they were analysing the financial implications of the new Civil Partnerships Act, the Treasury estimated it was 6%. Stonewall, a gay rights charity reckon that 5-7% “is a reasonable estimate”.

10% of the US?

Do those figures seem low? One reason they might is that the number one in ten has long-persisted in popular culture as a reliable guesstimate of homosexuality rates. That number made its way into public assumptions and poor press reporting through the Kinsey Reports, two books written by a zoologist at Indiana University – Sexual Behavior in the Human Male (written in 1948) and Sexual Behavior in the Human Female (1953).

Though the reports broke long-held taboos on reporting about sexual orientation, the methodology used by Kinsey quickly came under strong criticism for being extremely unreliable. Soon after it was published, statisticians from the American Statistical Association claimed “a random selection of three people would have been better than a group of 300 chosen by Mr. Kinsey“.

And yet, many people estimate even higher numbers than Kinsey himself did. In 2011, a Gallup poll asked over 1,000 adults across the US “what % of Americans today would you say are gay or lesbian?”. On average, respondents guessed that 1 in 4 Americans were.

Fascinatingly, Democrats guessed a higher % of Americans were gay than Republicans did (28% compared to 20%) and higher estimates were also given by lower-income Americans, less educated individuals, young people and women. So we know lots of people get it wrong, what do the latest statistics say?

Gay men outnumber gay women?

While 1.5% of men in the UK say they’re gay, only 0.7% of women say the same. But that trend is reversed when it comes to the identity ‘bisexual’ – 0.3% of men select this, compared to 0.5% of women. Slightly more women than men say ‘don’t know’ or refuse to answer the question – 3.8% compared to 3.5% of men.

Gay capital?

The percentage of Britons saying they’re gay, lesbian or bisexual is far higher in London than anywhere else in the UK – 2.5% compared to just 1.1% in Northern Ireland and 1% in the East of England.

Age?

Those aged between 16 and 24 were by far the most likely to say they were gay, lesbian or bisexual – 2.7% of them did – a proportion that steadily declines as you inch up the age scale.

One possible explanation

The more detailed breakdown of responses is revealing – it points to a potential problem with the survey. Maybe the huge differences between people’s estimates about the size of the gay population and their responses about their own sexual identification is about more than just bad guesses. Maybe it reveals the extent to which taboos persist (particularly for older people and those living in more conservative parts of the country) so individuals remain reluctant to tell the truth – a reluctance that manifests itself in under-estimates about personal sexual identity and over-estimates about other people’s.

Article Source

Categories
LGBT NEWS NEWS এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ ধর্মীয় ভাবনা বাংলাদেশ সমকামীদের অধিকার

সমকামিতা কি কোন জেনেটিক রোগ? – অভিজিৎ রায়

শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুলের অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমি যৌনপ্রবৃত্তি এবং জেন্ডার বিষয়ক একটি গবেষণাধর্মী বই লেখায় হাত দেই গত বছর। আমার লেখা আগেকার কিছু মালমশলা এমনিতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো, সেগুলোকে সংকলিত করে এবং আরো কিছু অধ্যায় বাড়িয়ে একটি বইয়ের আকারে রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বইটির নামকরণ করা হয়েছে – সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান । এধরণের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বই লেখার প্রয়াস বাংলাভাষায় সম্ভবত এই প্রথম। নিজের বই সম্পর্কে নিজের কিছু বলা সত্যই অশোভন, তাই বইটি সম্পর্কে আমি নিজে না বলে প্রকাশক বইটির ফ্ল্যাপে যা উদ্ধৃত করেছেন তা পাঠকদের জন্য নিবেদন করছি, বাকিটুকু বিচারের ভার পাঠকদের –

‘সমকামিতা’ বইটির নামকরণের মধ্যেই রয়েছে লেখকের অনুসন্ধিৎসু মননের এবং প্রথাভাঙ্গা বিষয়বস্তুর নির্দেশ। আধুনিক জীববিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের সর্বাধুনিক তথ্যের ভিত্তিতে স্পর্শকাতর এ বিষয়টির উদ্ভব এবং অস্তিত্বকে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। বৈজ্ঞানিক আলোচনার পাশাপাশি লেখক আর্থ-সামাজিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং মনোস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন দিক সুচারুভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রাণীজগতে সহস্রাধিক প্রজাতিতে যে সমকামিতার অস্তিত্ব রয়েছে তা এখন অনেকেই জানেন। মানব সভ্যতাও কিন্তু এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা থেকে শুরু করে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় সমকামিতার অস্তিত্বের পাশাপাশি, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকেও করা হয়েছে সমকামিতার উৎসের নিবিড় অনুসন্ধান। কিন্তু সমকামী মানুষদের যাত্রাপথ এবং তাদের যৌনতার স্বীকৃতির ব্যাপারটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না। ইতিহাস এবং সমাজ পরিক্রমার পটভুমিকায় সারা বিশ্ব জুড়ে সংখ্যালঘু যৌনপ্রবৃত্তির মানুষগুলোর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এ বইয়ে ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। জীবনের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতার অপশাসনে এতোদিন দীর্ণ করে রাখা হয়েছিলো, লেখকের যুক্তিনিষ্ঠ লেখনীতে বাংলায় প্রথমবারের মতো প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো শক্তিশালী এক সামাজিক ট্যাবুকে।

বইটা বেরুচ্ছে দিন কয়েকের মধ্যেই। যারা বইটি সংগ্রহ করতে চান, তারা প্রকাশকঃ আহমেদুর রশীদ চৌধুরী, ৯১ আজিজ সুপার মার্কেট (৩য় তলা) শাহবাগ, ঢাকা। ফোন : ৯৬৬৬২৪৭, ০১৭১৬৫২৫৯৩৯ যোগাযোগ করুন। বাংলা একাডেমীর বইমেলাতেও বইটি পাওয়া যাবে।

আমি ঠিক করেছি সামনে ধারাবাহিকভাবে পাঠকদের সামনে বইটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করব। বিষয়টি নিয়ে আমি আগে কিছু পোস্ট দিয়েছিলাম। সেগুলো পাওয়া যাবে এখানে –

আগের কিছু প্রাসঙ্গিক পোস্ট

 

বইটির সপ্তম অধ্যায়ের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য দেয়া হচ্ছে।

:line:

সমকামিতা কি কোন জেনেটিক রোগ?

 

মানসিক অথবা জেনেটিক  রোগ?
সমকামিতার ইতিহাস থেকে স্পষ্টই দেখা যায় যে, ইতিহাসের একটা বড় সময় জুড়েই সমকামীদের অবিরতভাবে যুদ্ধ করতে হয়েছে ‘সমকামিতা এক ধরণের মানসিক রোগ’ – সমাজে গেঁথে বসা এই মিথ্যা বিশ্বাসটি ভাঙতে। উগ্র ধর্মবাদীরা তো প্রথম থেকেই নানা পদের ঘোট পাকাতে সব সময়ই মুখিয়ে থাকতো, তার উপর মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে রঙ্গমঞ্চে হাজির হয়েছিলেন ‘মনোবিজ্ঞানী’ নামের বিজ্ঞানীরা। রিচার্ড ফ্রেইহার ইবিং সেই ১৮৮৬ সালে ‘সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস’ বইটির মাধ্যমে সমকামীদের গায়ে যে ‘মানসিক রোগের’ তকমা লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তারপর থেকে প্রায় একশ বছর ধরে সকল ‘ডিগ্রীধারী’ মনোবিজ্ঞানী আর ডাক্তারেরা যৌনতার এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিত্রিত করে গেছেন। শুধু তাই নয়, তারা সমকামীদের ‘রোগমুক্ত’ করতে পুরো উনিশ শতক জুড়ে নানাধরণের নিষ্ঠুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, অত্যাচার করেছেন, নির্যাতন করেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত একটা সময় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন যে,তারা যেমনটি আগে ভেবেছিলেন – সমকামিতা আসলে কোন রোগ নয়। আসলে স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় – সারা দুনিয়া জুড়ে সমকামী মানবাধিকার কর্মীরাই ডাক্তার এবং মনোবিজ্ঞানীদের মনে গেঁথে যাওয়া ‘বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার’ ভেঙ্গেছেন, তারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সমকামী হয়েও স্বাস্থ্যকর এবং সুখী জীবন যাপন করা যায়।

তার পরেও সমকামিতাকে এখনো অনেকেই ভুলভাবে এক ধরণের ‘রোগ’ বলে মনে করে থাকেন। তারা ভাবেন চিকিৎসার মাধ্যমে এই ধরণের রোগ আসলেই ভাল করে ফেলা সম্ভব। সত্যই কি তাই? ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদের রোগ বা ‘ডিজিস’ জিনিসটা কি সেটা ভাল করে বুঝতে হবে। মেডিকেলের অভিধানে রোগের যে সংজ্ঞা দেয়া আছে তা হচ্ছে[1] –

Disease is an impairment of the normal state of the body that interrupts function, causes pain, and has identifiable characteristics.

এই সংজ্ঞানুযায়ী সমকামিতা কোনভাবেই রোগ নয়, কারণ এটি শরীরে কোন ব্যাথা বেদনা ঘটাচ্ছে না, কিংবা শরীরের কোন ‘ফাংশন’ বিনষ্ট করেছে না। তারপরও স্বাভাবিক বা ‘নরমাল’ শব্দটি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। কারণ কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য তা উপরের সংজ্ঞায় স্পষ্ট করা হয়নি। একটি ব্যাপার এক্ষেত্রে পরিস্কার করে বলা দরকার যে, সমকামিতা আসলে একটি যৌন-প্রবৃত্তি। আর যৌন-প্রবৃত্তি জিনিসটা কোন রোগ নয়, যেটা চিকিৎসা করে ‘নিরাময়’ করা যেতে পারে। তারপরেও লাইসেন্সধারী ডাক্তাররা সমকামিতাকে একটা সময় ‘রোগ’ হিসেবে চিহিত করে তা ‘সারানর’ চেষ্টা করেছিলেন এবং সমকামিতা-চিকিৎসার যে সমস্ত দাওয়াই তারা বাৎলে দিয়েছিলেন তা কেবল ‘পিচাশ কাহিনী’ আর ‘হরর মুভি’ গুলোতেই দেখা যায়।তারা চিকিৎসার নামে কখনো রোগীদের ইলেক্ট্রিক শক দিতেন, কখনো মস্তিষ্কে সার্জারি করে একটা অংশকে অকেজো করে দিতেন, কখনোবা দেহে ইচ্ছেমতন হরমোন প্রবেশ করাতেন এমনকি খোঁজা পর্যন্ত করে দিতেন[2]। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতিটি ছিলো ‘অরুচি বা বমি চিকিৎসা’(Aversion therapy)। এই চিকিৎসায় সমকামী পুরুষকে চেয়ারে বসিয়ে নানা ধরণের যৌনকামনা উদ্রেককারী সমকাম-নির্ভর ছবি দেখানো হত, আবার সেই সাথে তার পুরুষাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ করে বমি করানোর চেষ্টা করা হত। জার্মানীতে আবার একটি চিকিৎসায় কবর থেকে মরা লাশ তুলে নিয়ে পুরুষাংগ ছেদন করে সমকামী রোগীর দেহের অভ্যন্তরে স্থাপন করা হত টেস্টোস্টেরন লেভেল বাড়ানোর জন্য,এবং এটি করা হত রোগীকে না জানিয়েই[3]। একবার ক্যাপ্টেন বিলি ক্লেগ হিল নামের ২৯ বছরের এক রোগীকে ১৯৬২ সালে এই বমি চিকিৎসার নামে এমন অত্যাচার করা হয় যে রোগী রীতিমত কোমাতে চলে যান এবং হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার লক্ষ্য এটাকে তখন ‘স্বাভাবিক কারণে মৃত্যু’ হিসেবে উপস্থাপন করে। প্রায় ত্রিশ বছর পরে পুনঃ তদন্তে বের হয়ে আসে যে সে সময় বমি চিকিৎসায় ব্যবহৃত এপোমরফিনের প্রভাবে বিলি সে সময় অচেতন হয়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন।

পিটার প্রাইস নামের এক ব্যক্তিকে সমকামিতা থেকে মুক্ত করার জন্য একটি জানালাবিহীন ছোট্ট খুপড়িতে তিনদিন ধরে আটকে রাখা হয়। তাকে বাইরে থেকে গালিগালাজ সমৃদ্ধ টেপ শোনানো হয়, আর ঘন্টায় ঘন্টায় ইঞ্জেকশন দিয়ে বমি করানো হয়। সেই বমি, প্রশ্রাব আর নিজের বিষ্ঠার মধ্যেই থাকে থাকতে বাধ্য করা হয়। তার এই অত্যাচারের কাহিনী হয়তো আজ নাৎসী বাহিনীর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সাথে তুলনীয় মনে হবে, কিন্তু পার্থক্য একটাই – ব্যাপারটি ঘটেছিলো ব্রিটেনের সম্ভ্রান্ত এনএইচএস হাসপাতালে[4]। এ ধরণের বহু নৈরাজ্যজনক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে সমকামিতার কৃষ্ণ ইতিহাস। সমাজের এই ধরণের ট্যাবু ভাংগতে ভাংগতেই প্রতিনিয়ত এগুতে হয়েছে সমকামীদের। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন স্বীকার করে নেয় সে সমকামিতা কোন রোগ নয়, এটি যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এটি সমকামিতার আইনী অধিকার এবং সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের লড়াইয়ে এক বিরাট মাইলফলক, এক ঐতিহাসিক বিজয়। আজ ২০০৯ সালে দাঁড়িয়ে এ কথা বলা যায় সমকামিতা যে যৌনতার একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এ ব্যাপারে প্রায় সকল চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরাই একমত পোষণ করেন (এই অধ্যায়ের প্রাসঙ্গিক বক্স দেখুন –‘ সমকামিতা কি কোন রোগ বা মনোবিকৃতি?’)। প্রসঙ্গতঃ, আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশন ১৯৯৪ সালে ‘স্টেটমেন্ট অন হোমোসেক্সুয়ালিটি’ শিরোনামে যে বিবৃতি জনসমক্ষে প্রকাশ করে, তার প্রথম দুটো অনুচ্ছেদ এখানে প্রণিধানযোগ্য[5] –

‘সমকামিতা নিয়ে গবেষণার ফলাফল খুবই পরিস্কার। সমকামিতা কোন মানসিক রোগ (mental illness) নয়, নয় কোন নৈতিকতার অধঃপতন। মোটা দাগে এটি হচ্ছে আমাদের জনপুঞ্জের সংখ্যালঘু একটা অংশের মানবিক ভালবাসা এবং যৌনতা প্রকাশের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম। একজন গে এবং একজন লেসবিয়নের মানসিক স্বাস্থ্য বহু গবেষণায় নথিবদ্ধ করা হয়েছে। গবেষণার বিচার, দৃঢ়তা, নির্ভরযোগ্যতা, সামাজিক এবং জীবিকাগত দিক থেকে অভিযোজিত হবার ক্ষমতা – সব কিছু প্রমাণ করে যে, সমকামীরা আর দশটা বিষমকামীর মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে পারে।

এমনকি সমকামিতা বিষয়টি কারো পছন্দ বা চয়েসের ব্যাপারও নয়। গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামী প্রবৃত্তিটি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই তৈরী হয়ে যায়, এবং সম্ভবত তৈরী হয় জন্মেরও আগে। জনসংখ্যার প্রায় দশভাগ অংশ সমকামী, এবং এটি সংস্কৃতি নির্বিশেষে একই রকমই থাকে, এমনকি নৈতিকতার ভিন্নতা এবং মাপকাঠিতে বিস্তর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। কেউ কেউ অন্যথা ভাবলেও, নতুন নৈতিকতা আরোপ করে জনসমষ্টির সমকামী প্রবৃত্তি পরিবর্তন করা যায় না। গবেষণা থেকে আরো বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামিতাকে ‘সংশোধন’-এর চেষ্টা আসলে সামাজিক ও মনঃস্তাত্ব্বিক কুসংস্কার ভিন্ন আর কিছু নয়’।

 

সমকামিতা কি কোন রোগ বা মনোবিকৃতি?

 

বিজ্ঞানীরা আজ মেনে নিয়েছেন যে, শুধু মানুষের মধ্যে নয় সব প্রানীর মধ্যেই সমকামিতার অস্তিত্ব আছে। কাজেই সমকামিতা প্রকৃতিজগতের একটি বাস্তবতা। আরো জানা গিয়েছে যে, সমকামিতার ব্যাপারটা কোন জেনেটিক ডিফেক্ট নয়। একটা সময় সমকামিতাকে স্রেফ মনোরোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হত। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন থেরাপি দিয়ে তাদের চিকিৎসা করতেন। এর মধ্যে শারিরীক নির্যাতন, শক থেরাপি, বমি থেরাপি সব কিছুই ছিলো, কিছু ক্ষেত্রে জোর করে এদের আচরণ পরিবর্তন করলেও পরে দেখা গেছে অধিকাংশই আবার তারা সমকামিতায় ফিরে যায়। এ ধরনের অসংখ্য নথিবদ্ধ দলিল আছে। আসলে বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাবার পর ডাক্তাররা এবং অন্যান্য অনেকেই আজ মেনে নিয়েছেন, সমকামিতা যৌনতার একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সেজন্যই কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে একমত হন যে সমকামিতা কোন নোংরা ব্যাপার নয়, নয় কোন মানসিক ব্যধি। এ হল যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ১৯৭৫ সালে আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশন  একইরকম অধ্যাদেশ প্রদান করে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন ১৯৮১ সালে সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে অব্যহতি দেয়।  আমেরিকান ইন্সটিটিউট তাদের মডেল পেনাল কোড সংশোধন করে উল্লেখ করে –‘ কারো ব্যক্তিগত যৌন আসক্তি এবং প্রবৃত্তিকে অপরাধের তালিকা হতে বাদ দেয়া হল’। আমেরিকান বার এসোসিয়েশন ১৯৭৪ সালে এই মডেল পেনাল কোডের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে সমকামিতাকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর ফলে সমকামীরা পায় অপরাধবোধ থেকে মুক্তি। আমেরিকান   ১৯৯৪ সালে আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশন তাদের ‘স্টেটমেন্ট অন হোমোসেক্সুয়ালিটি’ শিরোনামের একটি ঘোষণাপত্রে সমকামিতাকে একটি স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করে এবং  কারো যৌনপ্রবৃত্তিকে পরিবর্তন করার যে কোন প্রচেষ্টাকে অনৈতিক বলে উল্লেখ করা হয়। আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন ১৯৯৪ সালের একটি রিপোর্টে সমকামিতাকে স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, এবং অভিমত ব্যক্ত করে যে, সমকামীদের যৌনতার প্রবৃত্তি পরিবর্তনের চেষ্টা না করে বরং তারা যেন সমাজে ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারে আমাদের সেই চেষ্টা করা উচিৎ।   একাডেমী অব পেডিইয়াট্রিক্স এবং কাউন্সিল অব চাইল্ড এন্ড এডোলেসেন্ট হেলথ স্পষ্ট করেই বলে যে সমকামিতা কোন চয়েস বা পছন্দের ব্যাপার নয়, এবং এই প্রবৃত্তিকে পরিবর্তন করা যায় না।   ১৯৯৮ সালে ম্যানহাটনে কনফারেন্সে সাইকোএনালিটিক এসোসিয়েসন তাদের পূর্ববর্তী হোমোফোবিক ব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ১৯৯৯ সালে আমেরিকান একাডেমী অব পেডিয়াট্রিক্স, আমেরিকান কাউন্সিলিং এসোসিয়েশন, আমেরিকান এসোসিয়েশন অব স্কুল এডমিনিস্ট্রেটরস, আমেরিকান ফেডারেশন অব টিচার্স, আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশন, আমেরিকান স্কুল হেলথ এসোসিয়েশন, ইন্টারফেইথ এলায়েন্স ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব স্কুল সাইকোলজিস্ট, ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব সোশাল ওয়ার্কার এবং ন্যাশনাল এডুকেশন এসোসিয়েশন একটি যৌথ বিবৃতিতে সমাকামিতাকে একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাদের উপর যে কোন ধরণের আক্রমণ, আগ্রাসন এবং বৈষম্যের নিন্দা করেন। পশ্চিমা বিশ্বে কোন আধুনিক চিকিৎসকই সমকামিতাকে এখন আর ‘রোগ’ বা বিকৃতি বলে আর চিহ্নিত করেন না।

 

 

 

মনোবিজ্ঞানীরা রণে ভঙ্গ দিলেও পরবর্তীকালে ঘোট পাকাতে আবারো এগিয়ে আসলেন আরেকদল বিজ্ঞানের তকমা লাগানো কেউকেটাদের দল – আধুনিক জেনেটিক্স-ওয়ালারা। জিনগত গবেষণার ব্যাপারগুলো রঙ্গমঞ্চে আসার পর আবার নতুন করে সমাকামিতাকে ‘জেনেটিক ডিফেক্ট’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন কিছু কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’। কিন্তু সমকামিতার প্রবণতা যে কোন জেনেটিক ডিফেক্ট নয় এটা অনেক ভাবেই প্রমাণ করা যেতে পারে। কিভাবে সেটা? প্রথমকথা, সমকামিতাকে ‘জিনগত বিকৃতি’ বলার আগে জিনের সাথে সমকামিতার সত্যই সম্পর্ক আছে কিনা – তা পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা এখনো আমাদের কাছে ধোঁয়াশা। আমরা আগের অধ্যায়ে সমকামিতা নিয়ে জিনসংক্রান্ত গবেষণার কথা জেনেছি। জিনের সাথে সমকামিতার একটা যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা হলেও এটা কিন্তু আমাদের পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে – ‘গে জিন’ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা (এখনো) বের করতে পারেননি। ‘জিনগত’ কোন ফ্যাকটর যদি থেকেও থাকে সেটা হয়ত বেশ কয়েকটি জিনের প্রভাবের সম্মিলিত ফল হবে। আর শুধু জিনকে গোনায় ধরলেই হবে না, এর সাথে আসতে হবে পরিবেশের প্রভাব। এপিজেনিটিক্স নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বহু জিন পরিবেশের প্রভাবে নিজেদের সক্রিয়করণ (activation) বা নিষ্ক্রিয়করণ (deactivation) ঘটায় – অনেকটা বিদ্যুতের বাতির সুইচ অন অফ-এর মতই। এই নতুন শাখাটি থেকে আমরা জানতে পারছি পরিবেশ থেকে সংকেত নিয়ে দেহ কিভাবে তার অভ্যন্তরস্থ জিনের প্রকাশভঙ্গিকে (genetic expression) বদলে ফেলে[6]। কাজেই জিন এবং পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ব্যাপারটি পুরোপুরি পরিস্কার না হলে আমরা সমকামিতাকে এখনই ‘জেনেটিক’ বলে রায় দিতে পারি না, আর জেনেটিক রোগ বলা তো আরো পরের কথা।

যদি আমরা তর্কের খাতিরে ধরেও নেই জিনের সাথে সমাকামিতার সরাসরি একটা সম্পর্ক রয়েছেই, তারপরও এটাকে জনপুঞ্জের প্রকারণ বা ভ্যারিয়েশন না বলে ‘রোগ’ বলাটা বালখিল্যই হবে। আসলে আমরা যদি বিবর্তনের পটভূমিকায় চিন্তা করি, তাহলে যে কোন দেহজ বৈশিষ্ট্যই আসলে কোন না কোন ‘জেনেটিক মিউটেশন’-এর ফল। কেউ লম্বা, কেউ বেঁটে, কারো চুল কালো, কারোটা বাদামী, কারো চোখ কালো, কারোটা আবার কটা। এগুলো কোনটিকেই আমাদের সমাজে ‘জেনেটিক রোগ’ বলে চিহ্নিত করা হয় না। আমার এক বন্ধুর চোখের রঙ পুরোপুরি নীল। এবং সে এই রঙ নিয়ে যার পর নাই গর্বিত। কিন্তু যেহেতু আমার চারপাশের সবার চোখেরই রঙই আমি দেখি কালো বা বাদামী, কাজেই আমার বন্ধুর চোখকে কি আমি ‘রোগাক্রান্ত’ বলে রায় দিয়ে দিতে পারি? আমি কি তাকে গিয়ে বলতে পারি যে, যেহেতু আমার দেখা চারপাশের সবার চোখের রঙের সাথে তার রঙ মেলে না, সেহেতু তার চোখের রঙ বদল করে অন্যদের মত করে ফেলা উচিৎ? না, আমি তা মোটেই বলতে পারি না, আর বললেও বন্ধুটি সেটা মেনে নেবে কেন? কারণ, জেনেটিক মিউটেশনের ফলে সৃষ্ট চোখের এই নীল রঙ তার কোন সমস্যা করছে না। বরং তার চোখের এই নীল রঙ নিয়ে সে চলনে বলনে একেবারে কেতাদুরস্ত। তার কাছে এই মিউটেশন অপছন্দনীয় নয়, বরং দারুণ গর্বের।

সমকামিতার ব্যাপারটিকেও আমার বন্ধুর নীল চোখের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ধরা যাক, চোখের নীল রঙের মতই সমকামিতাও কোন এক জেনেটিক মিউটেশনের ফল। কিন্তু মিউটেশন হয়েছে বলেই কি আমরা তাকে জেনেটিক রোগ বলে অভিহিত করে দেব, আর সকল সমকামীদের বলব যে সমকামিতা ছেড়ে বিষমকামিতার জগতে চলে যেতে? আমার নীল চোখা বন্ধুটি যেভাবে আপত্তি জানাতো তার চোখের রঙ পরিবর্তনের কথা বললে, বহু সমকামীই সেভাবে আপত্তি জানাবে, তাদের যৌনপ্রবৃত্তি পরিবর্তনের কথা বলতে গেলে। তাদের অনেকেই কিন্তু এই সমকামী প্রবৃত্তি নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে না, বরং তারা গর্বের সাথেই প্রতিবছর ‘গে-প্রাইড’[7] মার্চে অংশ নিচ্ছে। তারা মনে করে, তাদের এই সমকামী প্রবৃত্তি কারো কোন সমস্যা করছে না, স্বাভাবিক কোন কাজকর্মের ক্ষেত্রেও এটি বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে না। কাজেই সমকামী প্রবৃত্তি তাদের কাছে কোন রোগ নয়, বরং একটি স্বাভাবিক প্রকারণ (variation) মাত্র।

আর এ কথা তো বলাই বাহুল্য যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি প্রকারণ যখন ‘অনুপযুক্ত’ বা ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন তা আপনা আপনিই বাতিল হয়ে যায়। কারণ ক্ষতিকর মিউটেশনবাহী এ সমস্ত জীব বংশবৃদ্ধি করার আগেই মৃত্যুবরণ করে ফলে তারা উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু যে মিউটেশন গুলো বাড়তি উপযোগিতা দেয় (যেমন, দু পায়ের উপর ভর করে দাড়ানোর ক্ষমতা, কিংবা মস্তিস্কের বৃদ্ধি ইত্যাদি) কিংবা থাকে আপাতঃ নিরপেক্ষ (যেমন, সাদা হাড় কিংবা নীল চোখ ইত্যাদি) সেগুলো প্রকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিলুপ্ত হয় না, বরং পজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাহিত হয়। এ কথা নিঃসন্দেহ যে সমকামিতা শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, সমস্ত প্রাণী জগতেই প্রবলভাবেই দৃশ্যমান। সমকামিতা যদি সত্যই ‘জেনেটিক ডিফেক্ট’ হত, তা হলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকনির মধ্য দিয়ে মিলিয়ন বছর ধরে যাবার ফলে বহু আগেই বাতিল হয়ে যাবার কথা ছিলো। প্রকৃতিতে হাজার হাজার জিনিস বিলুপ্ত হয়ে গেছে – কিন্তু সমকামী প্রবনতা হয়নি। সমকামিতা নামক প্রবনতাটি প্রানী জগতে বহাল তবিয়তেই রাজত্ব করছে অনাদিকাল থেকেই। কাজেই সমকামিতাকে প্রকারণ না বলে রোগ বলাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

জেনেটিক রোগের বিপরীতে সমকামিতার অবস্থানের আর একটি বড় কারণ হল সংখ্যাধিক্য। আমরা আগের একটি অধ্যায়ে দেখেছি, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী আলফ্রেড কিন্সের রপোর্ট অনুযায়ী প্রতি দশ জন ব্যক্তির একজন সমকামী । খুব রক্ষণশীল হিসাবও যদি ধরা হয় সেটা কোনভাবেই পৃথিবীর সামগ্রিক জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগের কম হবে না। আর জেনেটিক ডিফেক্ট সে তুলনায় অনেকটাই দুর্লভ ঘটনা। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। বিজ্ঞানীরা বলেন, জেনেটিক রোগের দুর্লভতার পরিমাপ (degree of rarity) নির্ধারিত হয় দুইটি বিদ্যমান প্রক্রিয়ার সাংঘর্ষিক মিথস্ক্রিয়ায়। এদের মধ্যে একটি হল পরিব্যক্তি বা মিউটেশনের মাধ্যমে সৃজন (formation by mutation) এবং অন্যটি হল প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বর্জনের হার (rate of elimination by natural selection)। এই দুইয়ের প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হয় দুর্লভতার স্তর যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় পরিব্যক্তি-নির্বাচন ভারসাম্য (mutation-selection equilibrium)[8]। নীচের সারণী থেকে জেনেটিক রোগ এবং প্রকারণের একটা সম্পর্ক স্থাপন করা যেতে পারে –

সারণী .  দুর্লভতা এবং রোগের প্রকোপের মধ্যকার পারষ্পরিক সম্পর্ক

জন্ম ডারউইনীয় ফিটনেসের হ্রাস জেনেটিক রোগ নাকি প্রকারণ?
প্রতি ১০ জনে ১ ০.০০১%  

 

প্রকারণ

প্রতি ১০০ জনে ১ ০.০১%
প্রতি ১০০০ জনে ১ ০.১%
প্রতি ১০,০০০ জনে ১ ১%
প্রতি ৫০,০০০ জনে ১ ৫%  

জেনেটিক রোগ

প্রতি ১০০,০০০ জনে ১ ১০%
প্রতি ১,০০০,০০০ জনে ১ ১০০%

 

যদি কোন জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়, তবে সেটি এক মিলিয়নে একটি ঘটতে দেখা যায় (সারনী ৭.১ এর সর্বশেষ সারি দ্রঃ )। দেখা গেছে, যদি ডারউইনীয় ফিটনেসের হ্রাসের হার শতকরা ১০ ভাগে নেমে আসে, তবে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বেড়ে প্রতি একশ হাজারে একটিতে উঠে আসে। যদি ফিটনেসের হ্রাস শতকরা পাঁচ ভাগ থাকে, তবে তবে সেই জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ঘটবে প্রতি পঞ্চাশ হাজারে একটি। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, প্রতি পঞ্চাশ হাজারে একটি বৈশিষ্ট্য থাকার হারকে জেনেটিক রোগাক্রান্ত হবার প্রান্তসীমা হিসেবে গন্য করা যেতে পারে[9]। অর্থাৎ, সোজা কথায় – মিউটেশনের মাধ্যমে কোন জেনেটিক বৈশিষ্ট সংঘটনের হার যদি প্রতি পঞ্চাশ হাজারে একটি বা তারো কম ঘটে, তবে সেটিকে জেনেটিক রোগ হিসেবে গন্য করা যেতে পারে, তার বেশি হলে নয়।

উদাহরণ হিসেবে এখানে হান্টিংটন ডিজিজ – নামে একটি জেনেটিক রোগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি ঘটে প্রতি ১০০,০০০ জনে ৪ থেকে ৭ টি। সঙ্গত কারণেই এটি জেনেটিক রোগ হিসেবে গন্য হবে। এরকম আরো জেনেটিক ডিফেক্ট আছে যেগুলো ঘটে খুব বেশি হলে প্রতি ৫০,০০০ জনে একটি করে ঘটে। এর সাথে তুলনা করলে বোঝা যায় – জেনেটিক ডিফেক্ট ( ৫০, ০০০ এ ১ টি) এর তুলনায় সমকামিতার এই হার ২৫০০ গুন বেশি (১০০ জনে ৫ জন ধরে হিসেব করলে)। তাই বিজ্ঞানীরা আজ বলেন[10] –

সমকামিতা কোন ধরণের ‘ম্যালফাংশানিং’ নয়… এটা নিয়ে কোন সন্দেহই নেই। সমকামিতা কোন জেনেটিক বিকৃতিও নয়, নয় কোন জেনেটিক রোগ।

তারপরেও কেউ যদি জেনেটিক ডিফেক্টের কথা বলেন, তাহলে তাদের প্রানীজগতে সমকামিতার ব্যাপারটাও কিন্তু ব্যাখ্যা করতে হবে, কারণ আমরা আগের অধ্যায়গুলোতে দেখেছি প্রানীজগতেও কিন্তু সমকামী প্রবণতার হার একেবারে ফেলনা নয়। বনবো শিম্পাঞ্জিদের সমকামিতা প্রবণতা এতই বেশি যে এটা হেটারোসেক্সুয়াল রিলেশনশিপের সাথেই তুলনীয়। জাপানী ম্যাকুয়ি নামের এক ধরণের বাঁদর নিয়ে গবেষকরা গবেষনা করে সমকামিতার উল্লেখযোগ্য প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। এছারা হাতি, সিংহ, চিতাবাঘ, হায়না, ক্যাঙ্গারু, হরিণ, জিরাফ, পাহাড়ি ভেড়া, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকার মোষ, জেব্রা উল্লেখযোগ্য। পাখিদের মধ্যে পেঙ্গুইন, ধুসর পাতিহাঁস, কানাডা পাতিহাঁস, কালো রজহাঁস, বরফী পাতিহাঁস, মিউট রাজহাঁস, শকুন সহ অনেক প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার সুস্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সরীসৃপের মধ্যে সমকামিতার আলামত আছে কমন অ্যামিভা, অ্যানোল, গিরগিটি, স্কিনক, গেকো মাউরিং, কচ্ছপ, রাটেল স্নেক প্রভৃতিতে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত ১৫০০র বেশী প্রজাতিতে সমকামিতা এবং রূপান্তরকামিতার অস্তিত্ব সনাক্ত করেছেন, এই বইয়ের চতুর্থ পর্বে বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই ধরে নেয়া হয়ত ভুল হবে না যে, প্রকৃতিতে সমকামিতার অস্তিত্ব সবসময় ছিলো, আছে, এবং থাকবে। কাজেই জেনেটিক ডিফেক্টের কথা যারা বলেন তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে কেন এই ‘জেনেটিক ডিফেক্ট’ প্রকৃতিতে এত সফলভাবে টিকে আছে। বলা বাহুল্য, এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

আররোগসারাতেই বা চায় কে?
যদিও সমকামী-রূপান্তরকামী-উভকামীদের আর এখন আর পশ্চিমা বিশ্বে জেনেটিক এবং মানসিক রোগাক্রান্ত হিসেবে আর গন্য করা হয় না, কিন্তু একটা সময় রোগ সারাবার নাম করে যাবতীয় কু-চিকিৎসা আর অপচিকিৎসা করে রীতিমত অত্যাচার আর নিপীড়ন করা হত। ইলেক্ট্রিক শক, মস্তিষ্কে সার্জারি, হরমোন চিকিৎসা কিংবা বমি চিকিৎসা’র নামে কিভাবে ‘মনোবিশেষজ্ঞ’রা সেসময় রোগীদের উপর ভয়াবহ সব অত্যাচারের পশরা সাজিয়ে বসেছিলেন তার কিছু উল্লেখ আমি করেছি এই অধ্যায়ের প্রথম দিকে। ইতিহাসের পাতা খুঁজলে দেখা যাবে, বিশেষজ্ঞদের এ ধরণের ‘চিকিৎসা’র শিকার শুধু সমকামীরাই হয়নি, হয়েছে অন্যান্য উপসর্গধারী রোগীরাও। কিছু উদাহরণ হাজির করা যাক।

এক সময় মৃগীরোগ বা হিস্টেরিয়ার চিকিৎসা করতে গিয়ে মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে ফেলে দিতেন ডাক্তারেরা[11]। তারা ভাবতেন হিস্টেরিয়াগ্রস্ত মেয়েরা যৌনোন্মাদ। এদের ভগাঙ্গুর কেটে মেয়েদের ‘ওভারসেক্সড’ হবার হাত থেকে রক্ষা করলেই হিস্টেরিয়াও কমে যাবে। ফলে ১৮৬০ সালের দিকে হিস্টেরিয়া চিকিৎসার নামে অসংখ্য মেয়েদের ক্লায়টোরিস কেটে ফেলে যৌন-প্রতিবন্ধী বানিয়ে ছেড়ে দিতেন ‘বিশেষজ্ঞ’ চিকিৎসকেরা। আর সেই কুকর্মের সাফাই গাইতেন এভাবে[12] –

‘আমাদের ধারণা ক্লাইটোরিস কেটে ফেলা মেয়েরা থাকে অনেক সুখি। তারা ঘুমায় ভাল করে, খায় ভাল করে, আর থাকে সারাদিন হাসিখুশি। আর তাছাড়া হিস্টেরিয়া চিকিৎসা করে ভাল করার মত রোগ নয়। কাজেই রোগীকে যতদূর শান্তি দেয়া যায়, সেটাই ভাল’।

ভাবছেন শুধু মেয়েদের ভগাঙ্গুরই ডাক্তারদের জন্য সমস্যা ছিলো? না হে গর্বিত পুরুষের দল, আপনাদের কপালেও শান্তি রাখেননি স্বনামখ্যাত ডাক্তারেরা। তাদের জন্য সমস্যা করেছে পুরুষদের লিঙ্গের নীচে ঝুলে থাকা বাড়তি চামড়াটুকুও। অর্থাৎ, ছেলেদের খৎনা করা নিয়েও ঘোট পাকিয়েছে ডাক্তারেরা বিস্তর। ১৯৬০ সালের দিকে আমেরিকায় জন্ম নেয়া শতকরা ৯৫ ভাগ শিশুর ত্বকচ্ছেদ করা হত। তারপর ১৯৭০ সালের দিকে আমেরিকান একাডেমী অব পেডিয়াট্রিক্স ঘোষণা করে যে – খৎনা করায় কোন ‘চিকিৎসাগত সুবিধা’ নেই। তারাই আবার ১৯৮৯ সালে গণেশ উলটে দিয়ে বলা শুরু করলো – এতে দারুণ ‘পোটেনশিয়াল বেনেফিট’ আছে। তারপর ১৯৯৯ সালে একাডেমীর পঞ্চাশ হাজার সদস্য উপসংহারে পৌঁছন যে, এই ‘বেনেফিট’ কোন ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়’[13]।

সমকামিতার ব্যাপারটি নিয়েও ঠিক একইভাবে জল ঘোলা করা হয়েছে বিস্তর। জেনেটিক্স বিজ্ঞানের রঙ্গমঞ্চে আসার পর সমকামিতা জেনেটিক রোগ কিনা সেটাও গবেষণা করে বের করতে চেয়েছিলেন গবেষকেরা। আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে মারিয়ার ‘এন্ড্রোজেন ইনসেন্সিটিভিটি সিন্ড্রোম’ এর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম – যার ফলে XY ক্রোমোজম বিশিষ্ট ‘পুরুষ’ সন্তান নারী কাঠামোর আদলে দেহ নিয়ে বেড়ে উঠে। গবেষকদল দেখতে চেয়েছেন সমকামীদের জিনের রিসেপ্টরে ‘এন্ড্রোজেন ইনসেন্সিটিভিটি সিন্ড্রোম’ এর মত কোন ‘সমস্যা’ আছে কিনা। তারা সমকামী ভাতৃযুগলের টেস্টোস্টেরন রিসেপ্টরের জিন পর্যবেক্ষণ করে তা বিশ্লেষণ করে দেখলেন। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই তারা খুঁজে পেলেন না[14]। টেস্টোস্টেরন রিসেপ্টরের জিন সমকামী বিষমকামী উভয় দলেই ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিলো, কোন প্যাটার্ণ ছাড়াই। ফলে সমকামিতার ব্যাপারটি যে ‘এন্ড্রোজেন ইনসেন্সিটিভিটি সিন্ড্রোম’ এর মত কোন কিছু নয়, তা পরিস্কারভাবে বোঝা গেল। এর আগে, জেনেটিক্স যখন জানা ছিলো না -কখনো বিকৃতি, কখনো মানসিক রোগ, কখনো অধঃপতন… এ ধরনের নানা স্তর পার হয়ে শেষ পর্যন্ত আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন ১৯৭৩ সালে যখন স্বীকার করে নিল যে সমকামিতা কোন রোগ নয়। হল এক নতুন যুগের সূচনা। কিন্তু তারপরেও যে সবাই এটি মেনে নিয়েছেন তা নয়। ধর্মীয় মদদপুষ্ট কিছু চিকিৎসকদের সংগঠন যেমন NARTH এক্স-গে মিনিশট্রি নামধারী কিছু ধর্মীয় সংগঠণ যেমন, ইক্সোডাস ইন্টারন্যাশনাল, এভারগ্রীন ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি সংগঠন বিচ্ছিন্ন ভাবে এখনো চিকিৎসার মাধ্যমে সমকামীদের ‘রোগমুক্ত’ করতে বদ্ধ পরিকর। তারা পুরুষদের আরো পুরুষালী আর মেয়েদের আরো মেয়েলী করে গড়ে তুলার চেষ্টা করে আর পাশাপাশি অরুচি চিকিতৎসার মত অপচিকিৎসা চালাচ্ছে এখনো। পাশাপাশি আবার পরিচালনা করে ধর্মীয় প্রার্থনা সভার। এই চিকিৎসার নাম দিয়েছে ‘রিপারেটিভ থেরাপি’ (প্রচলিত ভাবে অভিহিত করা হয় ‘কনভারশন থেরাপি’ হিসেবে)। তারা মনে করে এ ধরণের চিকিৎসা করে তারা সমকামী প্রবৃত্তি থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারছে। কিন্তু বাস্তবতা উলটো। গবেষক এরিয়েল শিডলো এবং মাইকেল শ্রোডার ২০০২ সালের একটি গবেষণা পত্রে[15] দেখিয়েছেন, শতকরা মাত্র ৩ ভাগ ক্ষেত্রে ‘রিপারেটিভ থেরাপি’র মাধ্যমে যৌনপ্রবৃত্তি বদল করা সম্ভব হয়েছে, শতকরা ৮৮ ভাগ ক্ষেত্রে এটি পুরোপুরি ব্যর্থ, এবং বাকীরা কোন অভিমত দেননি। ক্লিনিকাল মনোবিজ্ঞানী ডগলাস হাল্ডম্যান এ ধরনের চিকিৎসাকে ‘সুডো সায়েন্স’ বলে অভিমত দিয়েছেন[16]। বলা বাহুল্য, মূল ধারার কোন চিকিৎসকেরাই এই ‘রিপারেটিভ থেরাপি’কে এখন অনুমোদন করে না।

অনেক সময় আবার শর্ষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভুত। আশির দশকে আমেরিকায় একজন এস-গে মিনিস্ট্রির পরিচালনায় একটি সংগঠন তৈরি করা হয় ‘হমোসেক্সুয়ালস এনোনিমাস’ নামে। সংগঠনের উদ্দেশ্য সমকামিতার হাত থেকে জনগনকে মুক্তি দেয়া। কিন্তু সেই সঙ্ঘটনের দু জন সদস্য মিডিয়ায় অভিযোগ করেন যে, তাদের যৌনপ্রবৃত্তির পরিবর্তন তো হয়ই নি, বরং, সংগঠনের পরিচালক তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন । ‘এক্স গে লিবারেশন ইন জেসাস ক্রাইস্ট’ নামে আরেকটি সংগঠনের পরিচালকের বিরুদ্ধেও সেখানকার সদস্যদের উপর যৌন আগ্রাসনের অভিযোগ উঠে এবং তাকে পরিচালকের পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। একই ব্যক্তি তখন ১৯৮৬ সালে আরেকটি ‘গে মিনিস্ট্রি’ তৈরী করে এবং সেখানেও তার উপদেষ্টাদের সাথে যৌন-সংসর্গের অভিযোগ উঠে। তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সেই সংগঠন থেকেও পদত্যাগ করে আরেকটি এক্স-গে মিনিস্ট্রি স্থাপন করেন ১৯৯৩ সালে এবং সেখানেও তার সহকর্মীদের সাথে সমকামী যৌন সম্পর্কের অভিযোগ উত্থাপিত হয়[17]।

আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অবস্থা আরো ‘কেরোসিন’। সম্প্রতি সমকামিতা নিয়ে জণগনের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হবার পরিপ্রেক্ষিতে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য ‘অজ্ঞাতকূলশীল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের’ দিয়ে কলাম লেখানো হচ্ছে, কখনো বা বিশেষজ্ঞের অভিমত দেয়ানো হচ্ছে। এই সমস্ত ‘কলামিস্ট বিশেষজ্ঞরা’সমস্যা সমাধানের নামে এমন সমস্ত দাওয়াই বাৎলে দিচ্ছেন যে, তাতে শুধু তাদের জ্ঞানের দীনতাই ফুটে উঠছে না, সেই সাথে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হতাশাব্যঞ্জক দিকে। যেমন, কলকাতার বিখ্যাত আনন্দবাজার পত্রিকায় ২০০৩ সালের ২৯শে নভেম্বর জনৈক মৈনাক মিত্রের একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। চিঠিতে মৈনাক বলেন[18],

আমি পুরুষ হয়েও আরেক পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট। শারীরিকভাবে আমরা একে অপরকে ভোগ করছি। কিন্তু একটা সময় পর ছেলেটি পালিয়ে যায়। ওর কথা মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে…’

এর উত্তরে পত্রিকার ‘বিশেষজ্ঞ’ ঋতা ভিমানী সমস্যার সমাধান দিতে গিয়ে বলেন –

‘এই ধরণের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার একটা নতুন ট্রেন্ড এসেছে। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে যে অসম্পূর্ণতা আছে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।অন্যদিকে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। ছেলেটি যে চলে গেছে জানবেন তা আশীর্বাদ হয়েছে। সাঁতার কাটুন, ফুটবল খেলুন। মেয়েদের সাথে মেলামেশা করুন। যে সব বন্ধু-বান্ধব প্রেম করছেন তাদের কাছে জানতে চান মেয়েদের মনের কথা। নারীশরীরের মধ্যে যৌনতার আঁচ নিন। পুরুষালি কাজকর্ম করুন। সমকামী গে হয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু জানবেন এর মধ্যে যে নিয়মে সৃষ্টি চলেছে সেই আনন্দ নেই।’

সমকামিতাকে ‘নতুন ট্রেন্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ঋতা ভিমানী শুধু সমকামিতা বিষয়ে শুধু তার জ্ঞানের দীনতাই প্রকাশ করেননি, সেই সাথে রক্ষণশীল মহলের হাতকেও শক্তিশালী করলেন। সেই সাথে বাড়িয়ে তুললেন সমকামীদের মানসিক যন্ত্রণাকে। উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী সাপোর্ট গ্রুপের অন্যতম সদস্য সুখদের সাধুখাঁ এ ব্যাপারে তার প্রিক্রিয়া জানিয়ে বলেন[19],

‘দশ লক্ষ মানুষ যে পত্রিকা পড়ে, সেখানে এই ধরনের লেখা যদি ছাপা হয়, তাহলে সমকামীদের অবস্থাটা কী হবে একবার ভাবুন। বাড়িকে বোঝাবো কি করে? সবাই ভেবে নেবে,আমরা ইচ্ছে করেই বুঝি এমন আচরণ করি।ছোট থেকে তো অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই নিজের প্রকৃতিকে বদলাতে পারিনি। তাহলে এবার আমরা মরি, তাই কি আপনারা চান? বিষ কিনে দিন, খেয়ে মরি। তাহলে আপনারা বাঁচবেন। পরামর্শ দেবার নামে আমাদের নিয়ে খেলা হয়তো বন্ধ হবে।’

বাংলাদেশের অনেক পত্রিকাতেই আবার একই কায়দায় উপদেশ দিয়ে ইসলামী মূল্যবোধ অনুসরণ করতে পরামর্শ দেয়া হয়, বলা হয় এতে সমকামিতার মত বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পত্র-পত্রিকার পাতায় বিশেষজ্ঞ নামধারী অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত কীভাবে সমস্যাকে জটিল ও ভয়াবহ করে তুলতে পারে, তার কিছু বাস্তব উদাহরণ এগুলো।

এর বাইরেও বহু ‘বিশেষজ্ঞের’ অবিশেষজ্ঞীয় মতামত আছে। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে সিডনী স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘Why Gay Men Flee Bangladesh’ নামের প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডঃ শফিউল আজমের বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর শতকরা ৩.৫ ভাগ হারে সমকামিতা প্রকোপ বাড়ছে, আর এর পেছনে দায়ী করা হয় আর্সেনিকের কন্টামিনেশনকে। আরেকজন ‘বিশেষজ্ঞ’ সমকামিতার পেছনে দায়ী করেন হিন্দি ছবির প্রসারকে। বলা বাহুল্য পৃথিবীর আর কোন গবেষণাতেই আর্সেনিক কিংবা হিন্দি ছবিকে সমকামিতার পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সমকামিতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কেবল আর্সেনিক এবং বলিউড ছবিকে দায়ী করে অধ্যাপক আজমের যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছিলো, সেই গবেষণার সাথে এই গ্রন্থের লেখক দ্বিমত পোষণ করে। তপন রবি নামে এক ভদ্রলোক এককসময় মুক্তমনায় এ ব্যাপারে ২০০৬ সালে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আমাদের একটা প্রতিক্রিয়া আমাদের ফোরামে প্রকাশিত হয়েছিলো।

সমকামিতা কোন রোগ নয়, বরং এটিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে একে সারাবার চেষ্টার ‘অভিপ্রায়’টিকেই বরং রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আজ । গবেষক এরিক মার্কোস তার ‘ইস ইট এ চয়েস’ বইয়ে যে মন্তব্য করেছেন[20] তার সাথে হয়তো অনেকেই আজ একমত পোষণ করবেন –

যে সমস্ত থেরাপিস্টরা সমকামীদের যৌনপ্রবৃত্তি পরিবর্তন করতে চান, তাদের ধরে জেলে ভরা উচিৎ। মনোবিজ্ঞানীদের যেটা করা উচিৎ তা হল – রোগী যে প্রবৃত্তিরই হোক না কেন, তার অস্বস্তি দূর করে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে মনোবল বাড়িয়ে তোলা।

 

:line:

[1] See for example Medical dictionaries available on MedLine; http://www.nlm.nih.gov/medlineplus/mplusdictionary.html

[2] Eric Marcus, Is It a Choice? Answers to the Most Frequently Asked Questions About Gay & Lesbian People, HarperOne; 3 Revised edition, 2005

[3] Brian Wheeler, When gays were ‘cured’, BBC News Online Magazine; http://news.bbc.co.uk/2/hi/uk_news/magazine/3258041.stm

[4] Peter Tatchell, Aversion Therapy Exposed, Guardian 13 September 1997

[5] A statement from The American Psychological Association, July 1994

[6] বইয়ের পরিশিষ্টে মানব প্রকৃতি এবং প্রবৃত্তিগুলো কি জন্মগত নাকি আচরণগত? দ্রষ্টব্য।

[7] LGBT pride or gay pride is the concept that lesbian, gay, bisexual, and transgender (LGBT) people should be proud of their sexual orientation and gender identity. The modern “pride” movement began after the “Stonewall riots” in 1969.

[8] James F. Crow and Motoo Kimura, Introduction to Population Genetics Theory, Harper & Row Publishers, June 1, 1970

[9] Joan Roughgarden, Evolution’s Rainbow: Diversity, Gender, and Sexuality in Nature and People, University of California Press, May 17, 2004

[10] Joan Roughgarden, পূর্বোক্ত।

[11] Theatres of Madness, Deviant Bodies, edited by J.Terry and J. Urla, Bloomington, Indiana University Press

[12] Rachel P. Maines, The Technology of Orgasm: “Hysteria,” the Vibrator, and Women’s Sexual Satisfaction, The Johns Hopkins University Press, 2001

[13] Deborah Stead, Circumcision’s Pain and Benefits Re-Examined, New York Times, March 2, 1999

[14] J P Macke, N Hu, S Hu, M Bailey, V L King, T Brown, D Hamer, and J Nathans, Sequence variation in the androgen receptor gene is not a common determinant of male sexual orientation, Am J Hum Genet. 1993 October; 53(4): 844-652.

[15] Shidlo, Ariel; Schroeder, Michael, “Changing Sexual Orientation: A Consumers’ Report”, Professional Psychology: Research and Practice 33 (3), 2002

[16] “The Pseudo-science of Sexual Orientation Conversion Therapy”. ANGLES, the policy journal of the Institute for Gay and Lesbian Strategic Studies (IGLSS), www.iglss.org. 1999.

[17] Francis Mark Mondimore, A Natural History of Homosexuality, The Johns Hopkins University Press; 1 edition, 1996

[18] আনন্দবাজার ২৯/১১/০৩

[19] অজয় মজুমদার ও নিলয় বসু, সমপ্রেম, দীপ প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৫।

[20] Eric Marcus, Is It a Choice? Answers to the Most Frequently Asked Questions About Gay & Lesbian People, HarperOne; 3 Revised edition, 2005

:line:

“সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান” (প্রকাশিতব্য ২০০৯, শুদ্ধস্বর) থেকে উদ্ধৃত।

 

Source

Categories
এলজিবিটি সংবাদ

সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান

আজ শুদ্ধস্বরের প্রতিষ্ঠাতা এবং আমার নতুন বইয়ের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী (টুটুল) এর ফোন থেকে জানলাম যে, আমার এই বইটি আজকে বেরিয়ে গেছে এবং শুদ্ধস্বরের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। মুক্তমনার পাঠক এবং শুভান্যুধায়ীদের যারা এই বইটির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাদের বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে শুদ্ধস্বরে গিয়ে বইটি সংগ্রহ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

“সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান” – অভিজিৎ রায়
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুইয়ারী, ২০১০
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৬৪
প্রকাশক: শুদ্ধস্বর (আহমেদুর রশীদ চৌধুরী)
৯১ আজিজ সুপার মার্কেট (৩য় তলা) শাহবাগ, ঢাকা।
ফোন: ০১৭১৬৫২৫৯৩৯
ই-মেইল: shuddhashar AT gmail.com (AT এর বদলে @ বসিয়ে নেবেন, এবং আগে পরে স্পেসগুলো ডিলিট করে দেবেন)

বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে এখানে

দেশের বাইরে শুধু নয়, অর্ধ গোলার্ধ দূরত্বে অবস্থানের একটি বড় কুফল হল – বইমেলার কোন তথ্যই আমি ঠিকমতো পাইনা। এমনকি বইটা দেখতে কেমন হয়েছে, বাঁধাই কেমন হয়েছে – এগুলোও আমার পক্ষে জানা সম্ভব হচ্ছে না। আমার নির্ভর করতে হয় দেশে অবস্থিত মুক্তমনা লেখক এবং পাঠকদের উপর। যদি মেলাগত কোন শুভানুধ্যায়ী পাঠক বইটির ব্যাপারে অভিমত জানান, তবে  আমি কৃতজ্ঞ থাকবো এবং আনুষঙ্গিক তথ্য এই থ্রেডে আপডেট করে রাখা হবে।

এমনিতে আমি প্রকাশকের তরফ শুনেছি – বইটিকে ঘিরে আগ্রহ তৈরী হয়েছে। অনেকেই নাকি ফোন করে বইটির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছেন। আহমেদুর রশীদ টুটুল বইটির বিজ্ঞাপনও নাকি দিয়েছেন বেশ কিছু জায়গায়। আজ ফোনে জানালেন তিনি বইটির মোড়ক উন্মোচন পর্বও করতে চান কাল / পরশুর মধ্যেই। মুক্তমনার সুহৃৎ এবং শুভানুধ্যায়ীদের যারা মোড়ক উন্মোচন পর্বে থাকতে আগ্রহী তারা টুটুলের সাথে একটু যোগাযোগ করে সঠিক দিন এবং সময় জেনে নেবেন।

আমি বইটির সাথে সম্পর্কিত সবাইকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

নীচে বইটির ভুমিকা পাঠকদের জন্য দেয়া হল –

:line:

“এখানে ছাড়তে হবে সকল অবিশ্বাস
এখানে ধ্বংস হবে সকল ভীরু হতাশ্বাস।”

–দান্তের ডিভাইন কমেডিতে বর্ণিত নরকের প্রবেশদ্বারে উৎকীর্ণ পদাবলী, যা পরবর্তীতে মনীষী কার্ল মার্কস বিজ্ঞানের প্রবেশদ্বারে খোদিত করে রাখতে চেয়েছিলেন আজীবন

উৎসর্গ

সারা বিশ্বের অগনিত সংখ্যালঘু যৌনপ্রবৃত্তির মানুষদের মুক্তিসংগ্রামে যারা নির্ভয়ে আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের পুরোধা আমেরিকার গ্রীনউইচ গ্রামের স্টোনওয়াল ইন-এর সংগ্রামী মজদুরদের

এবং

বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসারে, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং মননের বিকাশে আত্মনিবেদিত সকল লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং সমাজকর্মীদের উদ্দেশ্যে

:line:

ভূমিকা

সময় পাল্টাচ্ছে। নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল্টাচ্ছে আমাদের সনাতন মন মানসিকতা। খসে পড়ছে দীর্ঘদিনের নীতি নৈতিকতার কালো চাদরে ঢাকা মলিন আবরণগুলো। ভেঙ্গে পড়ছে শতাব্দীর ঘুনে ধরা সমাজের প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের অচলায়তন। শুরুটা হয়েছিলো পশ্চিমে অনেক আগেই, এর ঢেউ এখন আছড়ে পড়তে শুরু করেছে পূবের উপকূলেও। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সম্প্রতি নয়াদিল্লির হাইকোর্ট সমকামিতা অপরাধ নয় বলে রায় দিয়েছে (জুলাই, ২০০৯) । ১৪৮ বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক আইনে সমকামিতাকে যেভাবে ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনতা’ হিসেবে গণ্য করে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো – এ রায়ের মধ্য দিয়ে সেটির অবসান ঘটল। সমকামিতা নামক যৌনপ্রবৃত্তিটি ভারতের মত দেশে প্রথম বারের মত পেল কোন ধরণের আইনী স্বীকৃতি। দিল্লি হাইকোর্ট সমকামিতা নিষিদ্ধ আইনকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়েছে, সুস্পষ্টভাবে একে মানুষের ‘মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন’ বলে রায় দিয়েছে।

নিঃসন্দেহে এ এক ঐতিহাসিক যাত্রা, শুধু সমকামীদের জন্য নয়, সার্বিকভাবে মানবাধিকারের জন্যও। কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় যৌনতার বিপ্লব সূচিত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে – সেই নবজাগরণের যে ঢেউ আজ ভারতে এসে পড়েছে, কিন্তু তার ছোয়া বাংলাদেশে এখনো তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশের সমকামী যৌনতা আজ এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশের প্রধান প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা সচেতন বুদ্ধিজীবী সমাজ নারী অধিকার, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান কিংবা বড়জোর পাহাড়ি কিংবা আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আজ কিছুটা সচেতনতা দেখালেও তারা এখনো যৌনতার স্বাধীনতা কিংবা সমকামীদের অধিকার নিয়ে একদমই ভাবিত নয়। প্রকাশ্যে কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকেও দেখা যায় না ইস্যুটি নিয়ে কাজ করতে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে তাদের জন্য এ ধরণের আন্দোলন বা সচেতনতা তৈরীর প্রয়াস নেয়া যে কষ্ঠসাধ্য, তা সহজেই অনুমেয়। সমকামিতা অস্বীকৃত শুধু নয়, অনেক জায়গায় আবার এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখানে সমকামীদের হয় লুকিয়ে থাকতে হয়, কিংবা অভ্যস্ত হতে হয় ‘ক্লোসেটেড গে’ হয়ে ‘বিবাহিত’ জীবন যাপনে। তাদের অধিকার হয় পদে পদে লঙ্ঘিত। এর সুযোগ নিয়ে অনেক সময় খুব কাছের বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ঘটে আক্রমণ আর নানা পদের হেনস্থা। ‘সনাতন বাঙ্গালী কিংবা ধর্মীয় সংস্কৃতি’র ধারক এবং বাহকের দল আর অন্যদিকে ‘অপসংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে সদা-সোচ্চার স্বঘোষিত অভিভাবকবৃন্দ; কারো কাছ থেকেই সমকামীরা বিন্দুমাত্র সহানুভূতি প্রত্যাশা করতে পারে না। আসলে সমকামীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির একটা বড় কারণ আমাদের বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব। আর এ কথা বলে দেয়া নিষ্প্রয়োজন যে – সব পুরোন সংস্কৃতির মতই আমাদের সংস্কৃতিরও অনেকটা জুড়েই বিছানো আছে অজ্ঞতার পুরু চাদর। আমাদের সংস্কৃতিতে গুরুভক্তি যেমন প্রবল তেমনি লক্ষ্যনীয় ‘মান্য করে ধন্য হয়ে যাবার’ অন্তহীন প্রবণতা। আমরা গুরুজনদের বহু ব্যবহারে জীর্ণ আদর্শের বাণী আর অভিভাবকদের শেখানো বুলি তোতাপাখির মত আজীবন আউরে যেতে ভালবাসি। আমাদের ভয় অনেক। সীমাহীন স্ববিরোধ আর বংশপরম্পরায় চলে আসা প্রথা মান্য করে যাওয়াকেই আমাদের সমাজে ‘আদর্শ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এর বাইরে পা ফেললেই বিপদ। কিন্তু তারপরও কাউকে না কাউকে তো ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার’ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতেই হবে। এই বইয়ের মাধ্যমে প্রথম বারের মত বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য অজ্ঞতার চাদর সরানোর প্রয়াস নেয়া হয়েছে, সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ হাজির করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, সমকামিতা কোন বিকৃতি বা মনোরোগ নয়, এটি যৌনতারই আরেকটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। প্রাণীজগতে এখন পর্যন্ত পনেরশ’র বেশী প্রজাতিতে বিজ্ঞানীরা সমকামিতার সন্ধান পেয়েছেন। তার আংশিক তালিকা এ বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস খুঁজে দেখানো হয়েছে সমকামিতাকে যতই ‘অপসংস্কৃতি’ কিংবা ‘পশ্চিমা বিকৃতি’ বলে চিহ্নিত করা হোক না কেন, এর প্রকাশ প্রাচীনকাল থেকেই আছে আমাদের সংস্কৃতিতেও – অত্যন্ত প্রবলভাবেই।

এ দিকে, বহুদিন হতে চললো, জেন্ডার সচেতন প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থায় সমকামিতাকে মনোরোগ কিংবা বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। পশ্চিমের আধুনিক চিকিৎসকেরা এবং মনোবিজ্ঞানীরা এখন সমকামিতাকে একটি স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তিই মনে করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর American Psychiatric Association বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে একমত হন যে সমকামিতা কোন নোংরা ব্যাপার নয়, নয় কোন মানসিক ব্যধি। এ হল যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ১৯৭৫ সালে American Psychological Association-ও একইরকম অধ্যাদেশ দিয়েছিলো। তারপরেও যে সমকামীদের জীবন কুসুমাস্তীর্ণ হয়ে গেছে বলা যাবে না। আমেরিকার স্কুলগুলোতে একটু মেয়েলী গোছের ছেলেদের ‘গে’ প্রতিপন্ন করে আত্মহননের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে – এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকা এবং মিডিয়ার আলোয় উঠে এসেছে। শুধু সমকামী হবার কারণেই হত্যা করা হয়েছে ওয়াইয়োমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথু শেফার্ডের মত মেধাবী ছাত্রকে। আমেরিকায় এখনো গে এবং লেসবিয়ানরা সামাজিক স্বীকৃতি ও আইনগত বৈধতার জন্য আন্দোলন করছেন, অংশ নিচ্ছেন ‘গে-প্রাইড’ মার্চে। তাদের আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আমেরিকার বেশ কয়েকটি রাজ্যে সমকামী বিয়ে আজ স্বীকৃত। ব্রিটেনেও বিগত টনি ব্লেয়ারের সরকার কয়েক বছর আগে প্রথম সমকামী যুগলদের স্বীকৃতি দিয়েছে। কানাডায় আজ সমকামী, রূপান্তরকামী, উভকামী এবং উভলিঙ্গ মানবেরা সেখানকার অন্যান্য নাগরিকদের মতই সমান সুবিধা ভোগ করে থাকে, এমনকি তাদের মধ্যকার বিয়েও ‘সিভিল ম্যারেজ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। পশ্চিমে সমকামী-অধিকার আন্দোলনের সাফল্য এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি প্রধান দেশও তাদের আইন সংস্কারে এগিয়ে এসেছে। চীনে আগে মাও সে তুংয়ের আমলে মনে করা হতো, সমকামিতা হচ্ছে ‘পুঁজিবাদের বিকৃতি’। কিন্তু আশির দশক থেকে তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। নেলসন ম্যানডেলার নেতৃত্বে সাউথ আফ্রিকায় বর্ণবাদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যে নতুন সংবিধান হয় তাতে শুধু ধর্মই নয়, যৌনতা বিষয়ে কোনো বৈষম্য করা হবে না এমন ধারা সংযোজিত হয়। পাকিস্তানের মত রক্ষণশীল রাষ্ট্রেও উভলিঙ্গ মানবদের জন্য সমানাধিকারের আইন পাশ করা হয়েছে । আমরা আশা করব, যুগের দাবীর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও একটা সময় সমকামিতা এবং অন্যান্য যৌনপ্রবৃত্তির প্রতি সহিষ্ণু মনোভাব গড়ে উঠবে, একটা সময় পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ষাঁড়দের যাতাকলে নিয়ত পিষ্ট সংখ্যালঘু যৌনপ্রবৃত্তির মানুষগুলোর আইনী অধিকার স্বীকৃত হবে। আর সেজন্য দরকার আমাদের সবার বিজ্ঞানমনস্ক উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

এ বইটির প্রথম দিককার কিছু অংশ সিরিজ আকারে মুক্তমনা এবং সচলায়তন ব্লগে প্রকাশের সময় পাঠকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পেয়েছি। সে সময় বহু পাঠক তাদের মূল্যবান মতামত দিয়ে ধারাবাহিক সিরিজটির মানোন্নয়নে সহায়তা করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে আমাকে বিতর্কেও জড়াতে হয়েছে। বলা বাহুল্য, সে সমস্ত বিতর্কের ফলশ্রুতিতে যে সমস্ত নতুন নতুন তথ্যের সমন্বয় আমার বইয়ে ঘটেছে তার জন্যও সংশ্লিষ্ট পাঠক এবং ব্লগারদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ব্লগে প্রবন্ধটি প্রকাশের আগে ইন্টারনেটে সমকামিতার উপর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে কোন গঠনমূলক আলোচনা সমৃদ্ধ রসদ বাংলায় ছিলো না। বহু পাঠক আমাকে ইমেইল করে জানিয়েছেন যে, সিরিজটি তাদের সমকামিতা সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা আমূল বদলে দিতে সাহায্য করেছে। লেখক হিসেবে নিঃসন্দেহে এটি আমার এক বিরাট প্রাপ্তি। ২০০৭ সালে সচলায়তন ব্লগে পাঠকদের ভোটে এই সিরিজটি অন্যতম বর্ষসেরা লেখা হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছিলো। এ ছাড়া আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি থেকে প্রকাশিত মাসিক পড়শী পত্রিকায় আমার সিরিজের কিছু অংশ প্রকাশিত হয়েছিলো ‘সমকামিতা কি প্রকৃতিবিরুদ্ধ?’ শিরোনামে। মুক্তমনার অন্যতম সুহৃৎ কানাডার অটোয়ায় বসবাসরত কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিতের এমিরিটাস অধ্যাপক এবং সুলেখক ড. মীজান রহমান আমার পান্ডুলিপিটি আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন এবং সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। তাঁর অত্যন্ত তথ্যবহুল মতামত ‘বিকৃতি না প্রকৃতি’ শিরোনামে বইয়ের শেষে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডিরত স্নিগ্ধা আলি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে একটি ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন। স্নিগ্ধার লেখাটিও তার অনুমতি নিয়ে গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরতিশাদ আহমদ পান্ডুলিপিটি আদ্যোপান্ত পাঠ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন, যা পান্ডুলিপিটির মানোন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। সুইডেন নিবাসী মুক্তমনা সদস্য এবং মানবাধিকারকর্মী মাহবুব সাঈদ সমকামিতার উপর বেশ কিছু কেস স্টাডি সংগ্রহ করে এই বইয়ের জন্য দিয়েছেন। বইটির শেষ পর্যায়ে এসে আলী ইশতিয়াকের সাহায্য এবং সহযোগিতা আমাকে দারুণভাবে উপকৃত করেছে। এদের সকলের কাছে আমি ঋণী।

আমার জীবনসঙ্গিনী বন্যা (যিনি নিজেও একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক) তার শত ব্যস্ততার মধ্যেও পান্ডুলিপির প্রতিটি অধ্যায় পড়ে তার সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। যেখানে যেখানে পছন্দ হয়নি সেসমস্ত জায়গায় স্কুল শিক্ষিকাদের মতই লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে সংশোধনে বাধ্য করেছেন। তার মতামত আমার পান্ডুলিপি পরিমার্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে – তা বলাই বাহুল্য। প্রুফ রীডার হিসেবে অঞ্জন আচার্য্যের অবদান সত্যই আমাকে বিস্মিত করেছে। জেন্ডার বিষয়ক তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আমার পান্ডুলিপির শুধু শ্রীবৃদ্ধিই করেনি, আমার নিজের মানসজগৎকেও ঋদ্ধ করেছে পুরোমাত্রায়। সব্যসাচী হাজরার চমৎকার প্রচ্ছদটি বইটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। সবশেষে শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদের প্রেরণা এবং তাগাদা ছাড়া এ বই আলোর মুখ দেখতো না কখনোই। কাজেই এই বই পাঠকদের ভাল লাগলে সেই কৃতিত্বের সিংহভাগই বাংলাদেশের এই তরুণ এবং উদ্যমী প্রকাশকের প্রাপ্য।

আমি মনে করি আমার এ বইটি বাংলাদেশে বিজ্ঞানমনস্ক উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে আর এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

বইটির আনুষঙ্গিক কিছু তথ্য এবং স্যাম্পল অধ্যায় পড়া যাবে এখান থেকে

:line:

বইমেলার ছবি সংযোজন (কৃতজ্ঞতা রণদীপম বসু) :

রণদীপম বসুর ক্যামেরায় তোলা শুদ্ধস্বর স্টলের কিছু ছবি পাঠকদের জন্য দেয়া হল-

চিত্রঃ শুদ্ধ্বস্বরের নতুন বইগুলোর ভীরে আমার নতুন বইটি

চিত্রঃ বইটিকে ঘিরে পাঠকদের আগ্রহ? (মনে মনে ভাবিতেছি – কী যে ধরা খাইলাম!)

চিত্রঃ চশমা খুলিয়া চিন্তা – কি কিনিলাম, কেনই যে কিনিলাম!

ছবিগুলো মুক্তমনায় পাঠানোর জন্য রণদীপম বসুকে অসংখ্য ধন্যবাদ!

বইটি সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য আছে এখানে

 

Source

Categories
এলজিবিটি সংবাদ

Am I gay/lesbian, bi, ace/demi, straight or pan?

Your road map to the exciting exploration journey into the fascinating world of internet tests!
Here you can find thousands of tests in more than 20 different categories, and you can choose any of them depending where your interests lay. Fun, personality, IQ tests, love and relationship, quizzes, fan tests – everything is possible on AllTheTests.com. Want to check your knowledge in particular disciplines – here you are, anxious about your new relationship – don’t hesitate and test your second half, just in a mood to relax on a lazy sunny afternoon – a perfect fun test collection is waiting for you.

 

Take the Test 

Visit this helpful website by clicking below.

Source of Information 

 

 

Categories
LGBT NEWS NEWS এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ সমকামীদের অধিকার

সমকামী মস্তিস্ক এবং সমকামী জিনের খোঁজে – অভিজিৎ রায়

আমার এক নতুন খ্যাপা প্রকাশকের পাল্লায় পড়ে মানুষের যৌনপ্রবৃত্তি এবং জেন্ডার ইস্যু নিয়ে একটি বই লেখায় হাত দিয়েছি। তার ধারাবাহিকতায় এটি মুক্তমনায় পোস্ট করা হল। এই পোস্টের আয়তন দেখে আমি নিজেই ভরকে গিয়েছি।  কাজেই পাঠকদেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এই ‘হাতী মার্কা’ পোস্টের জন্য আগে ভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আরো ভয়ের কথা এই যে,  (‘সবে তো কলির সন্ধ্যে’ প্রবাদটিকে সার্থকতা দিতে গিয়ে) সামনে একই বিষয়ের উপর আরো কিছু পোস্ট আসছে!

রয়, সিলো আর ট্যাংগো – তিনে মিলে ছিলো এক পেঙ্গুইন পরিবার

 

রয়, সিলো আর ট্যাঙ্গো

রয়, সিলো আর ট্যাঙ্গো

ম্যানহাটনের সেন্ট্রাল পার্কের চিড়িয়াখানা। সেখানে এক পেঙ্গুইন দম্পতির বাস। একেবারে প্রেমিক দম্পতি যাকে বলে। ছ’বছর ধরে তারা একসাথে আছে। তাদের আলাদা করাই মুশকিল। এরা একে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে রাখে। এক সাথে গলা ছেড়ে ডেকে উঠে। আর শারীরিক যৌনসম্পর্ক তো আছেই। একটি দিকেই কেবল ব্যতিক্রম- এই পেঙ্গুইন দম্পতির দুজনেই পুরুষ। চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে যখন বুঝলেন তখন তো তাদের আক্কেল গুরুম। কার ভুলে প্রথম থেকেই এই পুরুষ পেঙ্গুইন দুটোকে এক সাথে রাখা হয়েছিল কে জানে। তবে এই ‘অস্বাভাবিক’ সম্পর্ক তো আর বেশী দিন চলতে দেয়া যায় না। কাজেই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন, তাদের খাঁচায় কিছু নারী পেঙ্গুইন ছেড়ে দেয়া হবে। তারা ভাবলেন, নারী সংগ পেয়ে নিশ্চয় তারা এই ‘বেলাল্লাপনা’ ত্যাগ করবে। কিন্তু রয় আর সিলো খাচাঁর নতুন মেয়েদের দিকে ভালমত তাকিয়ে দেখলোই না, সম্পর্ক তৈরি করা তো দূর কি বাত! তারা নিজেদের প্রেমে নিজেরাই মশগুল। কর্তৃপক্ষই আর কি বা করবেন ।

এর মধ্য আরেক ঘটনা ঘটলো। রয় সিলো দম্পতি তাদের বাসার পাশে পড়ে থাকা একটি বড় পাথরের টুকরো তাদের বাসায় নিয়ে এসে নিয়ম করে তা দিতে শুরু করলো। এটা দেখে বোধ হয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মনে একটু দয়া হলো। তারা আরেক ‘হেটারোসেক্সুয়াল’ পেঙ্গুইন দম্পতির কাছ থেকে একটি ডিম ধার করে নিয়ে এসে রয় আর সিলোর বাসায় রেখে দিলো। সেই ডিমে মাস খানেক ধরে নিয়ম করে তা দিয়ে রয় আর সিলো বাচ্চা ফুটালো। জন্ম হল এক ফুটফুটে মেয়ে পেঙ্গুইন শিশুর – ট্যাংগো। তারা সেই বাচ্চাকে নিজদের বাচ্চা হিসবেই আদর যত্ন করে বড় করে তুললো। বড় হয়ে ট্যাংগো নিজেও সমকামী পেঙ্গুইন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ‘তানুজি’  নামে আরেক নারী পেঙ্গুইনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে।

রয়-সিলো-ট্যাংগোর এই ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ ঘটনা নিয়ে ২০০৫ সালে আমেরিকায় প্রথম বাচ্চাদের জন্য একটি বই প্রকাশিত হয় And Tango Makes Three নামে [1] । আমেরিকায় শিশু সাহিত্যের ইতিহাসে সমকামিতাকে গঠনমূলকভাবে উপস্থাপনার প্রথম দৃষ্টান্ত এটি। কিন্তু আমেরিকার রক্ষণশীল মহল এতে খুশি হননি। তারা বইটিকে ‘শিশুদের জন্য ক্ষতিকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্কুলের লাইব্রেরীগুলোতে এই বইয়ের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করতে চান। কিন্তু আমেরিকার আদালতের রায়ে সেটা আর সম্ভব হয়নি।

 

প্রাকৃতিক বৈচিত্র

রয়, সিলো আর  ট্যাঙ্গোই একমাত্র উদাহরণ নয়। প্রকৃতিতে এ ধরণের উদাহরণ আছে অজস্র। ভেড়ার জীবন যাত্রা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা সমকামী প্রবণতার প্রচুর আলামত লক্ষ্য করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা বের করার বহু আগে থেকেই মেষপালকেরা ভেড়ার এই প্রবণতার কথা জানতেন। এই ধরনের ভেড়ার পাল সবসময়ই মেষপালকদের জন্য হতাশা। কারণ এরা বংশবিস্তারে কোন সাহায্য করে না। তারা প্রথম থেকেই ভেড়ীদের প্রতি থাকে একেবারেই অনাগ্রহী। এদের আগ্রহের পুরোটা জুড়েই থাকে আরেকটি পুরুষ ভেড়া বা মেষ। অরেগন হেলথ এন্ড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লস রসেলির মতে শতকরা ৮ ভাগ ভেড়া এরকম সমকামী প্রবৃত্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে [2] । এই ধরণের সমকামী ভেড়া সঙ্গমের সময় আরেকটি পুরুষ ভেড়ার দিকে অগ্রসর হয় তাদের আদর সোহাগ জানাতে থাকে আর যৌনাঙ্গ শুঁকতে থাকে। অবশেষে পেছন দিক থেকে ভেড়ার উপর আরোহন করে ভেড়ার উলের উপর বীর্জ নিক্ষেপ করে (এরা কখনোই পায়ুকামে প্রবৃত্ত হয় না)। চার্লস রসেলি এ সমস্ত ভেড়ার মস্তিস্ক বিশ্লেষণ করে দেখান যে এদের মস্তিস্কের কিছু অংশের আকার ‘স্বাভাবিক’ ভেড়াদের থেকে অনেকাংশেই ভিন্ন। তিনি ‘সেক্সুয়ালি ডাইমরফিক নিউক্লিয়াস’ বলে মাথার হাইপোথ্যালমাসের একটা অংশে উল্লেখ করার মত পার্থক্য পান [3] । একই ধরনের পার্থক্য আরেক গবেষক সিমন লেভি লক্ষ্য করেছেন সমকামী মানুষের মস্তিস্কেও (সিমন লেভির গবেষণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে একটু পরে) ।

ভেড়া ছাড়াও সমকামী আচরণ লক্ষ্য করা গেছে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রেও। এদের মধ্যে হাতি, সিংহ, চিতাবাঘ, হায়না, ক্যাঙ্গারু, হরিণ, জিরাফ, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকার মোষ, জেব্রা উল্লেখযোগ্য। পাখিদের মধ্যে পেঙ্গুইন, ধুসর পাতিহাঁস, কানাডা পাতিহাঁস, কালো রজহাঁস, বরফী পাতিহাঁস, মিউট রাজহাঁস, শকুন সহ অনেক প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার সুস্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সরীসৃপের মধ্যে সমকামিতার আলামত আছে কমন অ্যামিভা, অ্যানোল, গিরগিটি, স্কিনক, গেকো মাউরিং, কচ্ছপ, রাটেল স্নেক প্রভৃতিতে। সমকামিতার অস্তিত্ব আছে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, স্যালাম্যান্ডারের মত উভচর এবং বিভিন্ন মাছেও। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন প্রাইমেট বর্গের মধ্যে সাধারণ শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে প্রজননহীন যৌনতা (non-reproductive sex) খুবই প্রকট। মানুষের মতই তারা কেবল ‘জিন সঞ্চালনের’ জন্য সঙ্গম করে না, সঙ্গম করে আনন্দের জন্যও। শিম্পাঞ্জীদের আরেকটি প্রজাতি বনোবো শিম্পাঞ্জী (আগেকার প্রচলিত নাম ছিলো পিগমী শিম্পাঞ্জী)দের মধ্যে সমকামী প্রবণতা এতই বেশি যে, ব্যাগমিল  তার বিখ্যাত ‘বায়োলজিকাল এক্সুবারেন্স : ‘এনিমেল হোমোসেক্সুয়ালিটি এন্ড ন্যাচারাল ডাইভার্সিটি’  বইয়ে বলেন [4], এই প্রজাতিটির ক্ষেত্রে ‘সমকামী যৌনসংসর্গ, বিষমকামিতার মতই স্বাভাবিক। একেকটি গোত্রে এমনকি শতকরা ৩০ ভাগ সদস্য সমকামিতা এবং উভকামিতার সাথে যুক্ত থাকে এবং দেখা গেছে ৭৫ ভাগ যৌনসংসর্গই প্রজননহীন। এদের মধ্যে প্রবলভাবে আছে নারী সমকামিতাও। । বিভিন্ন রকমের সমকামী এবং উভকামী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে গরিলা, ওরাং-ওটান, গিবন, সিয়ামাং, লঙ্গুর হনুমান, নীলগিরি লঙ্গুর, স্বর্ণ হনুমান, প্রবোসিক্স মাঙ্কি, সাভানা বেবুন ইত্যাদি প্রাইমেটদের মধ্যেও।

বনোবো শিম্পাঞ্জীদের মধ্যে সমকামি প্রবণতা খুবই বেশি। বিজ্ঞানীরা এরকম ৪৫০টিরও বেশি প্রজাতিতে সমকামিতার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন।

বনোবো শিম্পাঞ্জীদের মধ্যে সমকামি প্রবণতা খুবই বেশি। বিজ্ঞানীরা এরকম ৪৫০টিরও বেশি প্রজাতিতে সমকামিতার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন।

১৯৭২ সালে লিন্ডা উলফি নামের এর তরুন গবেষক ল্যাবরেটরীতে জাপানী ম্যাকুয়ি নামের একধরণের প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, তাদের মধ্যে নারী সমকামিতার ব্যাপারটি প্রকটভাবে দৃশ্যমান। লিন্ডা ভাবলেন নিশ্চয়ই ল্যাবরেটরীর বন্দি পরিবেশে থাকার ফলে তাদের যৌনতার পরিবর্তন ঘটেছে (জেলখানায় থাকার ফলে আসামীদের মধ্যে যে ধরণের সমকামী মনোবৃত্তি জেগে উঠে অনেকটা সেরকম)। তিনি আসল ব্যাপারটি বুঝতে জাপানে গিয়ে বন্য পরিবেশে ম্যাকুয়ি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। গিয়ে তিনি কি দেখলেন? হ্যা, যা ভেবেছেন সেটাই – সেখানেও নারী সমকামিতা দেদারসে রাজত্ব করে চলেছে। শুধু লিন্ডা উলফি নয় পল ভ্যাসি নামে আরেক গবেষকও জাপানী ম্যাকুয়িদের উপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তিনিও ম্যাকুয়িদের মধ্যকার সমকামী প্রবণতা অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন এবং বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনেক গবেষক আগে ভেবেছিলেন, ম্যাকুয়ি সমাজে নারীতে নারীতে প্রেম আসলে পুরুষদের আকর্ষণের জন্য। নিশ্চয়ই চোখের সামনে এই ‘লেসবিয়ন পর্ণ’ দেখে পুরুষ ম্যাকুয়িরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং নারী ম্যাকুয়িদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। কিন্তু পল ভ্যাসি তার গবেষণায় পরিস্কার ভাবেই দেখালেন নারী ম্যাকুয়িরা যখন সমকামে মত্ত থাকে তখন তারা কোন পুরুষ ম্যাকুয়ির প্রতি কোন রকম আগ্রহই দেখায় না। তাদের জন্য সমকামিতার ব্যাপারটি ‘হট বাথ’ নেওয়ার মতন কেবলই আনন্দের।  ২০০৬ সালের হিসেব অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা প্রানীজগতে ১৫০০‘রও বেশী প্রজাতিতে সমকামিতার সন্ধান পেয়েছেন [5] । আর মেরুদন্ডী প্রাণীর তিনশ’রও বেশী প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্ব খুব ভালভাবেই নথিবদ্ধ । সংখ্যাগুলো কিন্তু প্রতিদিনই বাড়ছে।  উইকিপিডিয়ায় সমকামিতার আংশিক তালিকা পাওয়া যাবে এখানে। তালিকায় স্তন্যপায়ী প্রানী থেকে শুরু করে পাখি, মাছ, সরীসৃপ, উওভচর, কীটপতঙ্গ সবই আছে। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, পৃথিবীতে আসলে এমন কোন প্রজাতি নেই যেখানে সমকামিতা দেখা যায় না। এ প্রসংগে জীববিজ্ঞানী পিটার বকম্যানের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য –

“No species has been found in which homosexual behavior has not been shown to exist, with the exception of species that never have sex at all, such as sea urchins and aphids. Moreover, a part of the animal kingdom is hermaphroditic, truly bisexual. For them, homosexuality is not an issue.”

ন্যাশনাল জিওগ্রাগিক চ্যানেলে সম্প্রতি ‘Out in Nature: Homosexual Behavior in the Animal Kingdom’ নামের একটি ডকুমেন্ট্রিতে প্রানীজগতের অসংখ্য সমকামিতার উদাহরণ তুলে ধরা হয় । ইউটিউবে ভিডিওটি ছয় পর্বে রাখা আছে। পাঠকদের জন্য ভিডিওটির  প্রথম পর্বটি নীচে দেয়া হল –

httpv://www.youtube.com/watch?v=LFeXwKnCUNI

বাকী পর্বগুলো দেখা যাবে এখান থেকে ( পর্ব-২ | পর্ব-৩ | পর্ব -৪ | পর্ব -৫ | পর্ব -৬ )

ব্রুস ব্যাগমিল এবং জোয়ান রাফগার্ডেনের কাজের উপর ভিত্তি করে অসলোর ন্যাচারাল হিস্ট্রি যাদুঘরে ‘এগেইনস্ট নেচার?’ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রদর্শনীটি ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়ে আগাস্টের ২০০৭ সাল পর্যন্ত চলে। এতে জীবজগতের সমকামিতা, উভকামিতা সহ প্রকৃতির নানা ধরণের বৈচিত্রময় উদাহরণ হাজির করা হয়েছিলো। প্রদর্শনীটি সাড়া বছর জুড়ে দেশ বিদেশের অসংখ্য দর্শকের আগ্রহ এবং মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয় ।  মুক্তমনাতেও জৈববৈচিত্র তুলে ধরে অধ্যাপক মীজান রহমানের একটি চমৎকার পোস্ট আছে – বিকৃতি না প্রকৃতি শিরোনামে।

নরওয়ের অসলো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউসিয়ামে ‘এগেইনস্ট নেচার?’ নামে প্রদর্শনীটি দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে।

নরওয়ের অসলো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউসিয়ামে ‘এগেইনস্ট নেচার?’ নামে প্রদর্শনীটি দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে।

 

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব কি সমকামিতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে?

বহু বিজ্ঞানীই প্রানীজগতের মাঝে বিদ্যমান সমকামিতাকে প্রথমদিকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেননি। তারা যে প্রকৃতিতে সমকামিতা দেখেননি তা নয়, অনেকবারই দেখেছেন – কিন্তু অবধারিতভাবে ভেবে নিয়েছিলেন এটি বিবর্তনের বিচ্যুতি, এ নিয়ে গবেষণার কোন দরকার নেই। যেমন, ভ্যালেরিয়াস গিস্ট (Valerius Geist) নামের এক বিজ্ঞানী ক্যানাডিয়ান রকি পর্বতমালায় পাহাড়ী মেষদের মধ্যকার সমকামিতা পর্যবেক্ষণ করেও সেটা গুরুত্ব দিয়ে গবেষণায় লিপিবদ্ধ করেননি। আজ তিনি সেই ‘ব্যর্থতার’ জন্য প্রকাশ্যেই দুঃখ প্রকাশ করেন। আসলে কিন্তু ব্রুস ব্যাগমিলের ‘বায়োলজিকাল এক্সুবেরেন্স’ বইটি প্রকাশিত হবার পর বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা অনেকটাই বদলে গেছে। তারা এখন সমকামিতাকে গুরুত্ব দিয়েই জীববিজ্ঞানে গবেষণার দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করেন। ব্রুস ব্যাগমিলের গবেষনার পর অন্যান্য গবেষকেরাও গবেষণা চালিয়ে গেছেন বিষয়টি নিয়ে।

আসলে ডারউইনীয় বিবর্তনের দিক থেকে চিন্তা করলে সমকামিতার ব্যাপারটি জীববিজ্ঞানীদের জন্য সব সময়ই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ ‘ওটা বায়োলজিকাল ডেড এন্ড’ – অন্ততঃ এভাবেই ভাবা হত কিছুদিন আগেও। বিবর্তনের কথা ভাবলে প্রথমেই প্রজননের মাধ্যমে বংশ বিস্তারের কথাটিই মাথায় সবার আগে চলে আসে। সে দিক দিয়ে চিন্তা করলে সমকামিতার লক্ষ্য যে বংশবিস্তার নয় – তা যে কেউ বুঝবে। তাহলে জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে সমকামিতার উদ্দেশ্য কি? আগে এমনকি জীববিজ্ঞানীদের মধ্যেও সমকামিতাকে ঢালাওভাবে ‘অস্বাভাবিকতা’ কিংবা ‘ব্যতিক্রম’ ভেবে নেওয়াটাই ছিলো ট্রেন্ড, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধ্যান ধারনা অনেকটা বদলেছে।

প্রথম কথা হচ্ছে, সমকামিতার ব্যাপারটি কিন্তু নিখাঁদ বাস্তবতা। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, পুরো প্রানীজগতের ক্ষেত্রেই। জীববিজ্ঞানী ব্রুস ব্যাগমিল তার ‘বায়োলজিকাল এক্সুবারেন্স : এনিমেল হোমোসেক্সুয়ালিটি এন্ড ন্যাচারাল ডাইভার্সিটি’ বইয়ে প্রায় পাঁচশ প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্বের উদাহরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। আর আগেই বলা হয়েছে যে, সামগ্রিকভাবে জীবজগতে ১৫০০’রও বেশী প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। মানুষের মধ্যে শতকরা প্রায় ৫ ভাগ থেকে ১২ ভাগ সমকামিতার সাথে যুক্ত বলে পরিসংখ্যানে পাওয়া গেছে। কাজেই সমকামিতার এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা বোকামি। এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হল, সমকামিতাকে ব্যাখ্যা করার সঠিক বৈজ্ঞানিক মডেল জীববিজ্ঞানে আছে কিনা, নাকি কেবল ‘সমাকামিতা অস্বাভাবিক’ কিংবা ‘ব্যতিক্রম’ ইত্যাদি বলেই ছেড়ে দেয়া হবে? এ প্রসঙ্গে জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক জোয়ান রাফগার্ডেনের উক্তিটি খুবই প্রাসঙ্গিক –

‘My discipline teaches that homosexuality is some sort of anomaly. But if the purpose of sexual contact is just reproduction, then why do all these gay people exist? A lot of biologists assume that they are somehow defective, that some development error or environment influence has misdirected their sexual orientation If so, gay and lesbian people are mistake that should have been corrected a long time ago (thru Natural selection), but this hasn’t happened. That’s when I had my epiphany. When a scientific theory says something wrong with so many people, perhaps the theory is wrong, not the people’.

সমকামিতাকে যদি বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তবে আমাদের বের করতে হবে – ডারউইনীয় দৃষ্টিকোন থেকে এর উপযোগিতা কি। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে কঠিন বলে কেউ হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই। বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিদিনই। কিছু যোগসুত্র পাওয়া গেছে প্রাণী জগতে ‘স্টেরাইল ওয়ার্কার’ বা ‘বন্ধ্যা সৈন্যের’ -এর উদাহরণ থেকে। পিঁপড়ে, মৌমাছি, উই পোকা কিংবা বোলতার মত প্রজাতিতে এই ধরণের ‘বন্ধ্যা সৈন্যের’ উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এরা বংশবৃদ্ধিতে কোন ভুমিকা রাখে না। কিন্তু নিজেদের গোত্রকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে জনপুঞ্জ টিকিয়ে রাখে। মানুষের জন্যও কি এটা খাটে? বিবর্তনীয় মনোবিদ্যার আলোকে একটু চিন্তা করা যাক। এমন কি হতে পারে যে, সমকামী পুরুষেরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই আদিম শিকারী-সংগ্রাহক সমাজে (hunter gatherer societies) বাচ্চা লালন পালনে কোন বিশেষ ভুমিকা রেখেছিলো? নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে যখন একাধিক পুরুষ দলবদ্ধ হয়ে গোত্রের দায়িত্ব নিতো আর শিকারের সন্ধান করত, সেই গোত্র হয়ত অনেক বেশী খাবারের যোগান পেত, কিংবা হয়ত বহিঃশত্রুর হাত থেকেও রক্ষা পেত অন্যদের চেয়ে বেশী। ফলে টিকে থাকার প্রেরণাতেই হয়ত কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষে পুরুষে সম্পর্ক তৈরী হয়েছিলো –যা গোত্রে এনে দিয়েছিলো বাড়তি নিরাপত্তা। কিংবা হয়ত এমনও হতে পারে – যখন শক্তিশালী পুরুষ শিকারে যেত, হয়ত সেই গোত্রের কোন ‘গে চাচা’ রক্ষা করার দায়িত্ব নিত ছোট ছোট ছেলেপিলেদের। আর পুরুষটিও শিকারে বের হয়ে স্ত্রীর ‘পরকীয়া’র আশঙ্কায় ভাবিত থাকতো না! ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, বহু রাজা বাদশাহরা তাদের হারেম সুরক্ষিত রাখতে ‘খোঁজা প্রহরী’দের নিয়োগ দিতো। আরো সমীক্ষায় দেখা গেছে পশ্চিমে মেয়েরা অফিসে সমকামী পুরুষদের সাথে কাজ করতে অনেক নিরাপত্তা অনুভব করে। এটার কারণও অবোধ্য নয়। হয়ত জিন সঞ্চালন ছাড়াও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমাদের প্রজাতিটিকে টিকেয়ে রাখতে সমকামী সদস্যদের একটা ভূমিকা ছিলো। সেজন্য এডয়ার্ড ও উইলসন ‘কিন সিলেকশন’-এর মাধ্যমে হোমোসেক্সুয়ালিটিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন সেই ১৯৭৮ সালেই ।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক চিন্তা করা যেতে পারে। সমকামী প্রবৃত্তিটি হয়ত বিবর্তন প্রক্রিয়ার উপজাত বা সাইড ইফেক্ট। বিবর্তনের অনেক কিছুর কথাই আমরা জানি যেগুলো কোন বাড়তি উপযোগিতা তৈরি করে না। কিন্তু এগুলো উৎপন্ন হয়েছে বিবর্তনের উপজাত হিসবে। এই বৈশিষ্টগুলো যদি টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি কোন অসুবিধা তৈরি না করে তাহলে তারা উপজাত হিসেবে রয়ে যেতে পারে বংশ পরম্পরায়। বিজ্ঞানী স্টিফেন যে গুল্ড উপজাতের ব্যাপারটা বোঝাতে আমাদের বাড়ির উদাহরণ হাজির করতেন। যে কোন বড় বাড়ি কিংবা ইমারতের দিকে দেখলে দেখা যাবে – এর ধনুকাকৃতির দু’টি খিলানের মাঝে স্থান করে নিয়েছে ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির স্প্যান্ড্রেল বা মাঝখানের একটা খোলা জায়গা। বাড়ীর ইমারত বানাতে খিলান থাকা অত্যাবশক, কিন্তু খিলান বানাতে গেলে বাড়তি উপজাত হিসবে স্প্যান্ড্রেল এমনিতেই তৈরী হয়ে যায়, যা ইমারতটির ভিত্তির জন্য অত্যাবশকীয় কোন কিছু হয়ত নয়, কিন্তু এটি এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে আমাদের শরীরের হাড্ডির সাদা রঙের কথা ধরা যেতে পারে। এই সাদা রঙ বিবর্তনে কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয় না। এই সাদা রঙ তৈরি হয়েছে হাড়ে ক্যালসিয়াম থাকার উপজাত হিসেবে। তেমনি কারো কারো চোখের নীল কিংবা বাদামী রঙও হয়ত কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয়া না – এটা প্রকৃতিতে আছে বিবর্তনের সাইড ইফেক্ট হিসবে। সমাকামিতাও বিবর্তনের সেরকম কোন উপজাত হতে পারে। ইংল্যান্ডের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রবিন ডানবার সেজন্যই মনে করেন, মানুষের মধ্যে সম্ভবত বিবর্তনের বাই-প্রোডাক্ট। তিনি বলেন, ‘homosexuality doesn’t necessarily have to have a function. It could be a spin-off or by-product of something else and in itself carries no evolutionary weight’।

ইতালীর একটি সমীক্ষায় (২০০৪) দেখা গেছে, যে পরিবারে সমকামী পুরুষ আছে সে সমস্ত পরিবারে মেয়েদের উর্বরতা (fertility) বিষমকামী পরিবারের চেয়ে বেশি থাকে । আন্দ্রিয়া ক্যাম্পেরিও-সিয়ানির ওই গবেষণা থেকে জানা যায়, বিষমকামী পরিবারে যেখানে গড় সন্তান সন্ততির সংখ্যা ২.৩ সেখানে গে সন্তানবিশিষ্ট পরিবারে সন্তানের সংখ্যা ২.৭। তার মানে যে জেনেটিক প্রভাব মেয়েদের উর্বরা শক্তি বাড়ায় – সেই একই জিন আবার হয়ত ছেলেদের মধ্যে সমকামী প্রবণতা ছড়িয়ে দেয় – বিবর্তনের উপজাত হিসেবে। সেজন্যই ডঃ ক্যাম্পেরিও ক্যানি বলেন –

“We have finally solved the paradox … the same factor that influence sexual orientation in males promotes higher fecundity in females’

বিজ্ঞানী ডীন হ্যামারও প্রায় একই কথা বলেছেন একটু অন্যভাবে –

‘The answer is remarkably simple : the same gene that causes men to like men, also causes women to like men, and as a result to have more children’

বিবর্তন তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে সামাজিক নির্বাচন। আমরা দেখেছি প্রানীজগতে সমকামিতার প্রবৃত্তি একটি বাস্তবতা। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে সমকামিতা নেই, ছড়িয়ে আছে প্রাণিজগতের সকল প্রজাতির মধ্যেই। আসলে প্রকৃতিতে সবসময়ই খুব ছোট হলেও একটা অংশ ছিল এবং থাকবে যারা যৌনপ্রবৃত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের চেয়ে ভিন্ন। কিন্তু কেন এই ভিন্নতা? এর একটি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় ইকোলজিস্ট জোয়ান রাফগার্ডেন রোথসবর্গ তার “Evolution’s Rainbow: Diversity, Gender and Sexuality in Nature and People.” বইয়ে [6] । তিনি বলেন, যৌনতার উদ্দেশ্য সনাতনভাবে যে কেবল ‘জিন সঞ্চালন করে বংশ টিকিয়ে রাখা’ বলে ভাবা হয়, তা ঠিক নয়। যৌনতার উদ্দেশ্য হতে পারে যোগাযোগ এবং সামাজিকীকরন। তিনি বলেন :

‘যদি আপনি সেক্স বা যৌনতাকে যোগাযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখেন, তাহলে আপানার কাছে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে, যেমন সমকামিতার মত ব্যাপার স্যাপারগুলো – যা জীব বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর ধরে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। বনোবো শিম্পাঞ্জীদের মধ্যে সমকামী সংশ্রব বিষমকামীদের মতই দেদারসে ঘটতে দেখা যায়। আর বনোবোরা কিন্তু প্রকটভাবেই যৌনাভিলাসী। তাদের কাছে যৌনসংযোগের (Genital contact) ব্যাপারটা আমাদের ‘হ্যালো’ বলার মতই সাধারণ। এভাবেই তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে থাকে। এটি শুধু দলগতভাবে তাদের নিরাপত্তাই দেয় না, সেই সাথে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য আহরণ এবং সন্তানদের লালন পালনও সহজ করে তুলে’।

শুধু বনোবো শিম্পাঞ্জীদের কথাই বা বলি কেন, বাংলাদেশেই আমরা যেভাবে বড় হয়েছি সেখানে ছেলেদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব হলে একজন আরেকজনকে স্পর্শ করে, হাতে হাত ধরে কিংবা ঘারে হাত দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। ঝগড়া-ঝাটি হলে বুকে জড়িয়ে ধরে আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে। মেয়েরাও তাই। এই আচরণ একটু প্যাসিভ তবে এ ধরনের প্রেরনা কিন্তু মনের ভেতর থেকেই আসে। বলা বাহুল্য, এই প্রেরণার মধ্যে কোন জিন সঞ্চালনজনিত কোন উদ্দেশ্য নেই, পুরোটাই যোগাযোগ এবং সামাজিকীকরনের প্রকাশ।

যোগাযোগ আর সামাজিকরণের কথা মাথায় রেখেই জোয়ান রাফগার্ডেন তার বিবর্তনবিদ্যা সংক্রান্ত ‘ইভ্যলুশনস রেইনবো’  (উপরে উল্লিখিত) বইয়ে ‘যৌনতার নির্বাচন’ (sexual selection)-এর বদলে ‘সামাজিক নির্বাচন’ (social selection) – এর প্রচলন ঘটানোর প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, প্রানীজগতের সাংগঠনিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তাদের খাবার, সঙ্গী প্রভৃতির সঠিক নির্বাচনের উপর। প্রাণিজগতের এই নির্বাচনই কখনো রূপ নেয় সহযোগিতায়, কখনো বা প্রতিযোগিতায়। এবং এটাই শেষ পর্যন্ত সমস্ত পারিবারিক বিবিধ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক একগামিতা বা মনোগামিতে রূপ নিতে পারে (মানুষ ছাড়াও কিছু রাজহাঁস, খেঁকশিয়াল, কিছু পাখির মধ্যে একগামী সম্পর্ক আছে), কখনো বা রূপ নেয় বহু(স্ত্রী)গামিতা বা পলিগামিতা (সিংহ, বহু প্রজাতির বনের মধ্যে এরকম হারেম তৈরি করে ঘোরার প্রবণতা আছে), কখনোবা বহু(পুরুষ)গামিতা বা পলিঅ্যান্ড্রি (কিছু সিংহ, হরিণ এবং প্রাইমেটদের মধ্যে)তে। এমনকি অনেকসময় দলে একাধিক ‘জেন্ডারের’ মধ্যেও সম্পর্ক স্থাপিত হয়। যেমন, ব্লু গ্রীন সানফিশ নামের একপ্রজাতির মাছ আছে যেখানে এক একটি ঝাঁকে দুই পুরুষ মাছের মধ্যে সমধর্মীযৌনতার বন্ধন (same-sex courtship) গড়ে উঠে। এখানে মুখ্য পুরুষ মাছটি (এদের ‘আলফা মেল’ বলা হয়) একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তুলে আর তারপর অপর পুরুষ মাছটিকে সাথে নিয়ে তাদের যৌথ সাম্রাজ্যে স্ত্রীমাছগুলোকে ডিম পাড়তে আমন্ত্রণ জানায়। অনেকসময় দ্বিতীয় পুরুষ মাছটি স্ত্রী মাছের অনুকরণ করে স্ত্রী মাছের ঝাকের সাথে মিশে যায় – যা অনেকটা আমাদের সমাজে বিদ্যমান ক্রস-জেন্ডার প্রতিনিধিদের মতই। ড. রাফগার্ডেনের মতে, যৌন-প্রকারণ এবং সমধর্মী যৌনতা এভাবে প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে, যা অনেক সময়ই মোটা দাগে কেবল শুক্রানুর স্থানান্তর নয়। সামাজিক নির্বাচন হচ্ছে সেই বিবর্তন যা সামাজিক সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখে। ড. রাফগার্ডেনের মত সামাজিক নির্বাচনের ধারণাকে সমর্থন করেন ব্রুস ব্যাগমিল এবং পল ভ্যাসি সহ অনেক বিজ্ঞানীই।

তবে বেশিরভাগ জীববিজ্ঞানীই এখনই ‘যৌনতার নির্বাচনকে’ সরিয়ে দিয়ে ‘সামাজিক নির্বাচন’কে গ্রহণ করার পক্ষপাতি নন, কারণ প্রকৃতিজগতের বেশিরভাগ ঘটনাকেই ‘যৌনতার নির্বাচন’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। নেচার পত্রিকায় রাফগার্ডেনের বইটির ভুয়সী প্রসংশা করার পরও তার ‘সামাজিক নির্বাচন’ তত্ত্বের সমালোচনা করে নৃতত্ত্ববিদ সারাহ হর্ডি বলেন – ‘(তার) এ (উদাহরণ) গুলো যৌনতার নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য উপযুক্ত কারণ নয়, বরং এগুলো হতে পারে জীব-বৈচিত্রকে (সামাজিকভাবে) গ্রহণযোগ্য করার অনুপ্রেরণা’। এর কারণ আছে। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমেই হোমসেক্সুয়ালিটিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সমকামিতার জিন (যদি থেকে থাকে) যোগাযোগ ও সামাজিকতার উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে উপযোগী তা বনোবো শিম্পাঞ্জীদের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি সত্য হতেই পারে । আবার এমনো হতে পারে মানুষের মধ্যে ‘গে জিন’-এর ভূমিকা পুরুষ এবং স্ত্রীতে ভিন্ন হয়। ইতালীর একটি সমীক্ষার (২০০৪) কথা আমরা আগেই জেনেছি – যা থেকে বেরিয়ে এসেছে, যে প্রকরণটি পুরুষদের মধ্যে সমকামিতা ছড়াচ্ছে সেটাই মেয়েদের ক্ষেত্রে আবার উর্বরাশক্তি বাড়াচ্ছে। এছাড়া ‘কিন সিলেকশন’-তত্ত্বের সাহায্যেও সমকামিতাকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব বলে অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন। ইন্টারনেটের বহুল-প্রচারিত টক-অরিজিনের একটি লিঙ্কেও বিবর্তনের আধুনিক তত্ত্বের মাধ্যমে সমকামিতার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কাজেই যে কারনেই সমাজে হোমোসেক্সুয়ালিটির অস্তিত্ব থাকুক না কেন, এবং সেগুলোকে উপস্থাপনের সঠিক মডেল নিয়ে বিবর্তনবাদীদের মধ্যে যত বিতর্কই থাকুক না কেন (বলা বাহুল্য, বিজ্ঞানে এধরনের বিতর্ক খুবই স্বাভাবিক), এটি এখন মোটামুটি সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সমকামিতার মত যৌন-প্রবৃত্তিগুলো ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও তত্ত্বের সাহায্যেই এই ধরনের যৌন-প্রবৃত্তিগুলোকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে; জীববিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা কিন্তু সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। আজ আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন সারা পৃথিবী জুড়ে চারশ’রও বেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ‘গে জিন’ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। কাজেই সমকামিতার ব্যাপারটি এখনো জীববিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার সজীব একটি বিষয় – যে কোন সম্ভাবনার এক অবারিত দুয়ার!

 

মস্তিস্কের  যৌনতাঃ নারী ও পুরুষ

সমকামীদের যৌনপ্রবৃত্তি আমাদের পরিচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিষমকামী লোকজনের থেকে আলাদা, এটা আমরা জানি। কারণ তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে আকর্ষণ অনুভব করে সমলিঙ্গের প্রতি। যেহেতু বিজ্ঞানের কাজই হচ্ছে প্রতিটি ঘটনার পেছনে যুক্তিনিষ্ঠ কারণ অনুসন্ধাণ, তাই বৈজ্ঞানিক পেশায় নিয়োজত অনেক গবেষকই অনুমান করলেন সমকামিতার পেছনেও নিশ্চয় কোন বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে হবে। কিন্তু কারণের উৎসটা কোথায়? তাদের মস্তিস্কের আকার, আকৃতি বা গঠন কি সাধারণদের থেকে একটু আলাদা? এ ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে পুরোমাত্রায়। ভাবনার কারণ আছে। কারণ যৌন-প্রবৃত্তির কেন্দ্রীয় উৎস হল মস্তিস্ক। মস্তিস্কই নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের নানা পছন্দ, অপছন্দ, ঘৃণা, অভিরুচি আর ফ্যান্টাসি। মস্তিস্কই জীবনের বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সিদ্ধান্তে আসে আমাদের ঐশ্বরিয়াকে ভাল লাগতে হবে, নাকি শাহরুখকে। মস্তিস্কই সিদ্ধান্ত নেয় এই মুহূর্তে আমাদের ভুতের গল্প ভাল লাগবে, নাকি আবেগময় রোমান্টিক উপন্যাস। কাজেই যৌনপ্রবৃত্তি তৈরীতে মস্তিস্কের ভূমিকাটা কি সেটা বিজ্ঞানীদের জন্য খুব ভাল করে বোঝা চাই। কিন্তু সমকামী মস্তিস্ক বিশ্লেষণের আগে বিজ্ঞানীরা আরেকটি জিনিস খুব গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করেছেন। সেটা হচ্ছে নারী পুরুষের মস্তিস্ক আর অর্জিত ব্যবহারে পার্থক্য। বিজ্ঞানীরা প্রথম এধরণের গবেষণা শুরু করেছিলেন ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরদের মস্তিস্ক বিশ্লেষণ করে। ১৯৭৮ সালে ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার গোর্কি ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন ছেলে ইঁদুরের মস্তিস্কের হাইপোথ্যালমাস (hypothalamus) নামের প্রত্যঙ্গটি মেয়ে ইঁদুরের থেকে তিনগুন বড়। ঠিক একই ধরণের পার্থক্য বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে পেলেন মানুষের মস্তিস্ক বিশ্লেষণ করেও। পুরুষ মস্তিস্কের সুপ্রাকিয়াস্মিক নিউক্লিয়াসের (suprachiasmatic nucleus) আকার মেয়েদের চেয়ে প্রায় ২.৫ গুন বড় হয়। আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে কর্পাস কালোসাম (corpus callosum) এবং এন্টিরিয়র কমিসুরের (anterior commissure) নামে দুইটি প্রত্যঙ্গের আকার পুরুষদের প্রত্যঙ্গগুলোর তুলনায় বিবর্ধিত পাওয়া গেছে। কিন্তু এগুলোর কোন প্রভাব কি প্রাত্যহিক জীবন যাত্রায় আছে? এক কথায় জবাব দেয়া মুশকিল। তবে বহু বিজ্ঞানীই মনে করেন, ডারউইনের ‘যৌনতার নির্বাচন’ (Sexual selection) বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রেখে থাকে তবে এর একটি প্রভাব আমাদের দীর্ঘদিনের মানসপট তৈরিতেও পড়বে। যৌনতার উদ্ভবের কারণে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ একই মানব প্রকৃতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়ছে এক ধরণের মনোদৈহিক পার্থক্য – জৈববৈজ্ঞানিক পথেই। জীববিজ্ঞানীরা যেমন পুরুষ-নারীর মস্তিস্কের আকার আয়তন আর গঠন নিয়ে গবেষণা করেছেন, তেমনি তাদের অর্জিত ব্যবহার নিয়ে নানা ধরণের কৌতুহলোদ্দীপক কাজ করে চলেছেন বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা। তার কিছু সাম্প্রতিক ফলাফল আমি লিপিবদ্ধ করেছিলাম আমার ‘মানব প্রকৃতির জৈববিজ্ঞানীয় ভাবনা’  ই-বইটিতে। বইটির প্রাসঙ্গিক নারী পুরুষের শরীরবৃত্তীয় এবং ব্যবহারগত পার্থক্যসূচক   দিকগুলোর কৌতুহলোদ্দীপক কিছু আলোচনা আছে এখানে।

 

গে মস্তিষ্কের খোঁজে

বিজ্ঞানীরা ইঁদুর আর বানর নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেছেন, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে হাইপোথ্যালমাসের মধ্যে ‘মেডিয়াল প্রিঅপ্টিক’ বলে যে এলাকাটা (medial preoptic area) আছে, সেটা কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে যৌনতার পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে ছেলে ইঁদুরেরা মেয়ে ইঁদুরের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। বানর নিয়ে গবেষণা করেও বিজ্ঞানীরা একই ধরণের ফল পেয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হাইপোথ্যালমাস-বিশিষ্ট বানরদের আচরণ হয়ে থাকে অনেকটা ‘যৌন-প্রতিবন্ধী’র মত। মেয়ে বানরদের প্রতি তাদের কোন আকর্ষণই থাকে না। এ থেকে যৌনপ্রবৃত্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে হাইপোথ্যালমাসের গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। মানুষের ক্ষেত্রেও হাইপোথ্যালমাস নামের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গটির সাথে যৌনপ্রবৃত্তির সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তারা হাইপোথ্যালমাসের এলাকাকে অভিহিত করেন ইন্টারস্টিয়াল নিউক্লি অব দ্য এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালমাস (INAH) নামের এক বিদ্ঘুটে নাম দিয়ে। প্রতিটি নিউক্লিয়াসকে আবার তারা বিভিন্ন নম্বর দিয়ে – INAH1, INAH2, INAH3, INAH4,। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার গোর্কি এবং তার এক ছাত্রী লরা এলেন আশির দশকে মানুষের মস্তিস্ক বিশ্লেষণ করে দেখলেন ছেলেদের মস্তিস্কের তৃতীয় ইন্টারস্টিয়াল নিউক্লি অব দ্য এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালমাস (INAH3)এর আকার মেয়েদের থেকে অন্ততঃ তিনগুন বড় পাওয়া যাচ্ছে।

১৯৯০ সালে সিমন লেভি নামের এক আমেরিকান প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী চিন্তা করলেন নারী পুরুষের হাইপোথ্যালমাস নিয়ে যখন এত কথা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে সমকামী ব্যক্তিদের হাইপোথ্যালমাসের কি অবস্থা সেটা একটু মেপে জোখে দেখা দরকার। তিনি ১৬ জন সমকামী পুরুষের এবং ছয় জন সমকামী মহিলার হাইপোথ্যালমাসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালালেন। তিনি দেখলেন, গোর্কির মতই তিনিও ছেলেদের INAH3-এর আকার মেয়েদের চেয়ে আকারে দু’গুন বড় পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সাথে আরো একটা জিনিস পেলেন। সেটা হল – INAH3-এর আকার বিষমকামীদের পুরুষদের চেয়ে সমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে দু থেকে তিনগুন ছোট [7]। অর্থাৎ, সমকামী পুরুষদের নিউক্লি অব দ্য এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালমাস এর আকার মেয়েদের INAH3-এর সমান! লেভি পরবর্তীতে একটি হাসপাতালের ৪১ জন রোগীর উপর একই পরীক্ষা করেন। সেখানেও তিনি একই ফলাফল পেয়েছিলেন। লেভির এই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি পরবর্তীতে উইলিয়াম বাইন নামের আরেকজন বিজ্ঞানী করেছিলেন । তিনিও একই ফলাফল পেয়েছেন, অর্থাৎ, সমকামী পুরুষদের নিউক্লি অব দ্য এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালমাসটি আকারে বিষমকামী পুরুষদের চেয়ে ছোট, এবং অনেকটা মেয়েদের সমান।

 

 

চিত্রঃ বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মস্তিস্কের তৃতীয় ইন্টারস্টিয়াল নিউক্লি অব দ্য এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালমাস (INAH3)এর আকার বিষমকামীদের পুরুষদের চেয়ে সমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে দু থেকে তিনগুন ছোট হয়। (ছবিতে ক্লিক করে বড় করে দেখুন)

তার মানে কি? এর মানে কি এই যে সমকামী পুরুষদের মস্তিস্ক অনেকটা নারীসুলভ? বলা মুশকিল। বিজ্ঞানীরা এই অনুকল্পটিকে আরেকটু বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করার চেষ্টা করলেন। তারা জানেন, শুধু INAH3-এর আকারেই নয়, মস্তিস্কের আরো অন্যান্য প্রত্যঙ্গের আকারেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। যেমন, মেয়েদের ভাষগত দক্ষতা যেহেতু ছেলেদের চেয়ে বেশি এবং একটু ভিন্নভাবে কাজ করে, তাদের কর্পাস কালোসাম (corpus callosum) এবং এন্টিরিয়র কমিসুর (anterior commissure) নামে দুইটি প্রত্যঙ্গের আকার পুরুষদের তুলনায় বড়। তাহলে সমকামীদের ক্ষেত্রে কি অবস্থা? হ্যা, আপনি যা সন্দেহ করেছেন তাই – সমকামী ব্যক্তিদের কর্পাস কালোসাম এবং এন্টিরিয়র কমিসুরের আকার বিষমকামী পুরুষদের চেয়ে আকারে বড় হয়, এবং মেয়েদের আকারের সাথে মিলে যায়। ১৯৯২ সালে লরা এলেন এবং রজার গোর্কি এন্টিরিয়র কমিসুর নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, সমকামীদের ক্ষেত্রে প্রত্যঙ্গটির আকার বিষমকামীদের চেয়ে বড় । আবার কর্পাস কালোসাম নিয়ে পরীক্ষা করে আরেকদল বিজ্ঞানী দেখেছেন, সমকামীদের ক্ষেত্রে এই প্রত্যঙ্গটির আকার বিষমকামীদের থেকে প্রায় শতকরা ১৩ ভাগ বেশী ।

তাহলে কি দাঁড়ালো? একসময় উলরিচস (হেনরিক উলরিচস জার্মান মনো বিজ্ঞানী, এবং সমকামী আন্দোলনের পথিকৃৎ) যেমনটি ভেবেছিলেন – ‘সমকামী পুরুষেরা আসলে পুরুষ দেহে বন্দি নারী আত্মার অতৃপ্ত প্রকাশ’ – সেটাই কি তবে ঠিক?। অনেক বিজ্ঞানী পূর্বেকার সীমিত পরীক্ষা থেকে পাওয়া সিদ্ধান্তে তাই ভেবে নিয়েছিলেন। ঢালাও ভাবে ভেবে নেয়া হয়েছিল- সমকামিতার প্রকাশ মানে ‘A female spirit in a male body’। সামাজিক ভাবেও আমরা দেখি সমকামী ছেলেদের ‘মেয়েলী’ বলে খোঁটা দেয়া হয়। তা হলে সত্যিই কি এই ‘স্টেরিওটাইপিং’ গুলোর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? কিন্তু এখানে এসেই দাবার ছক আবারো উলটে গেলো। মানুষের মস্তিস্কের হাইপোথ্যালমাসে সুপ্রাকিয়াস্মিক নিউক্লিয়াস (VIP SCN nucleus) নামের যে এলাকাটি আছে, যেটার আকার ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে বড় থাকে। তাহলে সমকামীদের ক্ষেত্রে এই প্রত্যঙ্গটির আকার কিরকম হবার কথা? নিশ্চয় ছোট এবং মেয়েদেরটার সমান তাই না? না, মোটেই তা নয় – সমকামীদের ক্ষেত্রে VIP SCN nucleus এর আকার পাওয়া গেল অনেক বড়, ছেলে মেয়ে দু দলের চেয়েই । সে জন্যই জোয়ান রাফগার্ডেন তার ‘ইভল্যুশন রেইনবো’ বইয়ে শ্লেষের সাথে লিখেছেন –‘ So much for the belief that gay man have female brains!’ তবে এ ব্যাপারে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি, হয়তো ভবিষ্যৎ গবেষণা এ ব্যাপারে আরো ভালভাবে পথ দেখাবে। আরো একটি ব্যাপারও এই সাথে লক্ষ্যনীয়। নারী সমকামীদের মস্তিস্কে এ ধরণের কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 

সমকামী পারিবারিক ধারার খোঁজে

আমার বাবা ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করতেন। আমিও ছোটবেলায় তাই খেলতাম। এ ধরণের অনেক বৈশিষ্ট্যই আমরা ঐতিহ্য হিসেবে বয়ে নিয়ে যাই, পারিবারিক পরিবেশ থেকে শিখে নিয়ে। মা ভাল রান্না করলে মেয়েকেও সেই গুণ পেতে সাহায্য করেন। আবার কিছু জিনিস না চাইলেও আমাদের বহন করতে হয় জেনেটিক তথ্য হিসেবে বংশ পরম্পরায়। চোখের এবং চুলের রঙ, নাকের গঠন, শরীর স্বাস্থ্য, হৃদরোগের ঝুঁকি সহ অনেক কিছুই। সমকামিতার ব্যাপারটিও আমরা পরিবারে বাহিত হতে দেখি। কিন্তু এটা কি জেনেটিক তথ্য হিসেবে পরিবারের ধারায় বয়ে চলে, নাকি পরিবেশ থেকে শেখা বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ?

বিজ্ঞানীরা এর উত্তর খুঁজতে প্রতিনিয়ত গবেষণা করে চলেছেন। তারা ইতোমধ্যেই দেখেছেন একটি জনসমষ্টিতে কোন ভাই বিষমকামী হলেও অন্ততঃ শতকরা ৪ ভাগ সম্ভাবনা থাকে তার পরবর্তী ভাইয়ের সমকামী হয়ে জন্মাবার। কিন্তু পরিবারের একভাই সমকামী হলে অন্ততঃ ২২ ভাগ সম্ভাবনা তৈরী হয় অপর ভাইও সমকামী হবার। অর্থাৎ পরিবারে সমকামী ভাই থাকলে পরিবারে সমকামী ধারা তৈরী হবার সম্ভাবনা অন্ততঃ চারগুন বেড়ে যায় [8]। কিন্তু ভাই সমকামী হলে বোন লেসবিয়ান নাকি স্ট্রেট হবে কিনা – এ সংক্রান্ত কোন সম্ভাবনার ঝোঁক পাওয়া যায়নি । কোন পরিবারে বোন সমকামী (লেসবিয়ান) হলে, অপর বোনেরও সমকামী হবার প্রবণতা দ্বিগুন বেড়ে যায়, কিন্তু ভাইয়ের উপর এর কোন সম্ভাব্যতার প্রভাব জানা যায়নি ।

যমজদের নিয়ে পরীক্ষা করেও কৌতুহলোদ্দীপক ফলাফল পাওয়া গেছে। ১৯৮৫ সালে রিচার্ড সি পিল্লার্ড এবং জেমস ডি ওয়েইনরিচ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন সমকামিতার ধারাটি সম্ভবতঃ জেনেটিক তথ্য হিসেবে প্রবাহিত হয়। তারা দেখালেন যে, সদৃশ যমজদের (identical twins) ক্ষেত্রে এক ভাই সমকামী হলে অন্ততঃ পঞ্চাশ ভাগ সম্ভাবনা থাকে অপর ভাইও সমকামী হবার। আর অসদৃশ যমজদের (fraternal twins) ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা থাকে চব্বিশ ভাগের মত। এরপর থেকে অন্ততঃ পাঁচটি যমজদের নিয়ে যৌন-প্রবৃত্তি সংক্রান্ত গবেষণার খবর লিপিবদ্ধ হয়েছে । ১৯৯১ সালে তাদের একটি গবেষণা থেকে জানা যায় সমকামী প্রবণতা সদৃশ যমজ দের মধ্যে ৫৭ ভাগ, অসদৃশ যমজ দের মধ্যে ২৪ ভাগ, এবং অযমজদের মধ্যে ১৩ ভাগ সমকামীভাবাপন্ন হয়ে থাকে । একইভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে নারী সমকামিতার প্রবণতা সদৃশ যমজে থাকে শতকরা ৫০ ভাগ, অসদৃশ যমজে থাকে ১৬ ভাগ, এবং অন্যান্যদের ক্ষেত্রে থাকে ১৩ ভাগ। ১৯৯৩ সালে এ ধরণের আরেকটি গবেষণা থেকে পাওয়া যায়, ছেলেদের সদৃশ যমজদের মধ্যে শতকরা ৬৫ ভাগ সমকামী প্রবৃত্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে আর অসদৃশ যমজদের ক্ষেত্রে সেটা ২৯ ভাগ । একইভাবে নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সদৃশ যমজের ক্ষেত্রে শতকরা ৪৮ ভাগ সমকামী হয়, আর অসদৃশ যমজের ক্ষেত্রে সেটা মাত্র ৬ ভাগ ।

উপরের জরিপ গুলো সবই ছিল আমেরিকার। ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডে এই ধরণের একটি জরিপ চালানো হয়। সেখানকার জরিপেও প্রায় একই ধরণের ফলাফল বেরিয়ে আসে, যদিও সংখ্যাটা অনেক কম। সদৃশ যমজদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগ এবং অসদৃশ যমজদের ক্ষেত্রে মাত্র ২.৫ ভাগ সমকামী পাওয়া গেছে । অস্ট্রেলিয়ায় একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে জরিপ চালানো হয়েছে। সেখানে অন্যান্য পদ্ধতির মত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে যমজ সহোদর বাছাই করা হয়নি, বরং বাছাই করা হয়েছে নির্বাচনের ভিত্তিতে। তাদের জরিপ থেকে যে ফলাফল এসেছে তা হল – সেখানে সদৃশ যমজদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ এবং অসদৃশ যমজদের ক্ষেত্রে মাত্র ০ ভাগ সমকামী পাওয়া গেছে; সদৃশ মেয়ে যমজদের শতকরা ২৪ ভাগ লেসবিয়ান হয় এবং অসদৃশ যমজদের ক্ষেত্রে সেটা প্রায় ১১ ভাগ ।

উপরের পরীক্ষাগুলোর শানে নজুল কি দাঁড়ালো তা হলে? পরীক্ষাগুলো থেকে একটি জিনিস স্পষ্ট ; সদৃশ যমজে দুই ভাইই সমকামী হবার সম্ভাবনা অসদৃশ যমজের দ্বিগুন পাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে সদৃশ যমজে দুই ভাইয়ের দুজনেই সমকামী হবার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ থেকে ৫০, এই ফলাফল নির্ভর করে কিভাবে বা কোথায় পরীক্ষা করা হচ্ছে তার উপর। তার মানে জেনেটিক ফ্যাক্টর যদি আমরা ২৫ থেকে ৫০ বলে রায় দেই, তবে পরিবেশ এবং অন্যান্য ফ্যাক্টরের প্রভাব ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ থেকেই যাচ্ছে।

এমনকি সদৃশ যমজদের দুই ভাইয়ের মধ্যেই সমকামিতা পাওয়ার যে ব্যাপারটিকে পুরোপুরি ‘জেনেটিক’ বলে ভাবা হচ্ছে, সেই দাবীও কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাও খোলা মনে বিশ্লেষণের দাবী রাখে। দুই সদৃশ যমজ ভাই সাধারণতঃ একই পরিবেশে একই ভাবে বড় হয়, এবং একজনের পছন্দ, অপছন্দ অভিরুচি অনেক সময় অপরজনকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করে। কাজেই, যে কেউ দাবী করতেই পারে যে, সদৃশ যমজে অসদৃশ যমজদের চেয়ে অধিক হারে সমকামী ভাতৃযুগল পাওয়া যাচ্ছে, এর কারণ ‘অভিন্ন জিন’ নয়, বরং তাদের বেড়ে উঠার ‘অভিন্ন পরিবেশ’। থিওডোর লিজ নামে এক মনোবিজ্ঞানী এই ব্যাপারটি উল্লেখ করে তার প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন একটি জার্নালে । এ উদাহরণটি আমাদের সামনে এ ধরণের পরীক্ষার জটিলতা স্পষ্ট করে তুলে। মুক্তমনাতেও ড. বিপ্লব পালের একটি চমৎকার প্রবন্ধ আছে এ ধরণের পরীক্ষার জটিলতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বলতা তুলে ধরে (সমকামিতার কি কোন জৈবিক ভিত্তি আছে?) । ফ্রয়েড যে কথাটা অনেক আগেই বলেছিলেন একটু অন্য ভাবে, সে কথাটাই হয়ত সত্য হয়ে ফিরে আসছে –

‘সমকামিতার ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরো গভীর। … কারণ [সদৃশ] যমজেরা যেন আয়নার প্রতিবিম্ব হিসেবে বেড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যকার স্বকাম (narcissism) আরো বিবর্ধিত করে তুলে’।

তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য আরেক ধরণের পরীক্ষা করা যেতে পারে। যদি কোন সদৃশ যমজ জন্মের সময়েই আলাদা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়, এবং সেই উপাত্ত যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তবে হয়ত ‘অভিন্ন’ পরিবেশের ফ্যাক্টরটি বাদ দিয়ে শুধু জেনেটিক ফ্যাক্টর আলোচনায় আনতে পারব, এবং বলতে পারবো সমকামী প্রবৃত্তি সত্যই জেনেটিক কিনা।

১৯৮৬ সালে এ ধরণের একটি পরীক্ষার কথা জানা যায় । ছয়টি সদৃশ যুগলের (চারটি ভগ্নি যুগল, এবং দুটি ভাতৃযুগল) সন্ধান পাওয়া যায় যারা আলাদা আলাদা পরিবেশে বড় হয়েছিলো, এবং যুগলদের মধ্যে একজন অন্ততঃ সমকামী। চারটি ভগ্নি যুগলের প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন সদস্য ছিলেন বিষমকামী, এবং অন্যজন সমকামী। একটি ভাতৃযুগলের ক্ষেত্রে দুই ভাইই ছিলেন সমকামী। একটি ‘গে বার’ এ পরিচয় হবার আগ পর্যন্ত এমনকি তারা একে অপরকে চিনতেনও না। আরেকটি ভাতৃযুগলের ক্ষেত্রে, দুই ভাই জন্মের পরেই বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা আলাদা পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। এক ভাই ১৯ বছর পর্যন্ত উভকামী হিসেবে জীবন যাপন করেছিলেন, এবং তারপর পরিপূর্ণ সমকামী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আর অন্য ভাই পনের থেকে আঠারো বয়স পর্যন্ত সমকামী ছিলেন, তারপর বিয়ে করে নিজেকে বিষমকামী হিসেবে সমাজে পরিচিত করেন। এই ক্ষেত্রে, অন্ততঃ সীমিত সময়ের জন্য হলেও উভয় সদস্যই সমকামিতার প্রবৃত্তি প্রদর্শন করেছিলো।

কাজেই উপরের পরীক্ষা থেকে একটি জিনিস বুঝা যাচ্ছে যে, জন্মের সময় বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়া ভাতৃযুগলে সমকামিতার উন্মেষের পেছনে জেনেটিক উপাদান থাকতে পারে, কিন্তু এই জেনেটিক প্রভাব ভগ্নিযুগলে পাওয়া গেছে অনেক কম।

কিন্তু এই পরীক্ষাই শেষ কথা নয়। সমকামিতার উপর পরিবেশের প্রভাব আদৌ আছে কিনা, আর থাকলে কতটুকু – সেটা জানার জন্য আরেক ধরণের পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বেইলি এবং পিল্লার্ডের ১৯৯১ সালের সেই পরীক্ষায় (আগে উল্লিখিত) দত্তক নেয়া সদৃশ যমজ সন্তানদের উপর জরিপ চালানো হয়। দেখা গেছে কোন সমকামী পরিবার বা ব্যক্তি দত্তক নিলে সেই ভাইয়ের সমকামী হিসেবে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা (১১%) অনেক বেশি থাকে বিষমকামী পরিবার দত্তক নেয়ের চেয়ে (৫%)। কাজেই এ সমস্ত পরীক্ষা থেকে বোঝা যাচ্ছে, জেনেটিক ফ্যাকটরের পাশাপাশি পরিবেশের প্রভাবটিও থেকে যাচ্ছে পুরোমাত্রায়। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে মুখ্য কারণ হিসেবে প্রতিপন্ন করাটা এই মুহূর্তে আসলে সরলীকরণই হবে ।

 

গে জিনের খোঁজে

১৯৯৩ সালে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের সমকামী বিজ্ঞানী ডিন হ্যামার এবং এঙ্গেলা প্যাতাউচির একটি যৌথ গবেষনাপত্র বিজ্ঞানের সম্ভ্রান্ত জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়  [9]। ডিন হ্যামারের সেই গবেষণাপত্রে শুধু সমকামী ধারাই নয়, সেই সাথে সমকামিতার উৎস হিসেবে ক্রোমোজমের মধ্যকার জেনেটিক একটি মার্কারের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে প্রকাশিত হয়। এই ব্যাপারটিকে পরবর্তীতে কিছু পত্রপত্রিকা এবং মিডিয়া ‘গে জিন’ বলে প্রচার শুরু করে, এবং এর ফলশ্রুতিতে পক্ষে বিপক্ষে নানা ধরনের বিতর্ক শুরু হয়। এই গবেষণাপত্রটি তাই খুব সতর্কভাবে পর্যালোচনার দাবী রাখে।

ডিন হ্যামেরের আলোচিত গবেষণাতেও আগের অন্যান্য গবেষকদের মতই পরিবারের মধ্যে সমকামী ধারা খোঁজার একটি চেষ্টা করা হয়েছে; এবং এ গবেষণা থেকেও সেই একই উপসংহার বেরিয়ে আসে – পরিবারে সমকামী ভাই থাকলে সমকামী ধারা তৈরি হবার প্রবণতা বেড়ে যায় । হ্যামার তার গবেষণা থেকে যে ফলাফল পেলেন তা হল – যদি এক ভাই সমকামী হয়, তাহলে ১৪ ভাগ সম্ভাবনা থাকে অন্য ভাইয়েরও সমকামী হবার, আর ভাই সমকামী না হলে সমকামী হবার সম্ভাবনা থাকে শতকরা মাত্র ২ ভাগ। কিন্তু হ্যামার এ পর্যন্ত গিয়েই থেমে গেলেন না। তিনি সমকামী পরিবারের দূরবর্তী আত্মীয় স্বজনদের পারিবারিক ধারাও বিশ্লেষণে আনলেন। আর এটা করতে গিয়েই বেরিয়ে এলো অজানা এক নতুন একটি দিক। তিনি দেখলেন, সমকামী ছেলের মামাদের মধ্যে শতকরা ৭ ভাগ এবং ফুতাতো ভাইদের মধ্যে শতকরা ৮ ভাগ সমকামী প্রবণতা সম্পন্ন পাওয়া ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাবার দিকে অর্থাৎ চাচা কিংবা চাচাতো ভাইদের মধ্যে সেরকম কোন প্যাটার্ণ পাওয়া গেল না।

চিত্রঃ সমকামী পরিবারের দূরবর্তী আত্মীয় স্বজনদের পারিবারিক ধারা বিশ্লেষণ করে ডিন হ্যামার দেখলেন, সমকামী ছেলের মামাদের মধ্যে শতকরা ৭ ভাগ এবং ফুফাতো ভাইদের মধ্যে শতকরা ৮ ভাগ সমকামী প্রবণতা সম্পন্ন পাওয়া ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি ধারণা করলেন সমকামী প্রবণতা মায়ের দিক থেকেই জেনেটিক ভাবে প্রবাহিত হয়। (ছবিতে ক্লিক করে বড় করে দেখুন)

তাহলে এর ব্যাখ্যা কি? সমকামী প্রবণতা কি তাহলে মায়ের দিক থেকেই জেনেটিক ভাবে প্রবাহিত হয়? ডিন হ্যামারের গবেষণা সে দিকেই ইঙ্গিত করে। আমরা জানি একটি ছেলের দেহে দু ধরণের ক্রোমোজম থাকে। একটি হল Y যা সে বাবার কাছ থেকে সরাসরি পায়, আর অন্যটি X ক্রোমোজম -যা সে পায় মায়ের দিক থেকে। কাজেই জেনেটিক প্রবণতা মায়ের দিক থেকে পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হবার অর্থ হচ্ছে X ক্রোমোজমে তার ছাপ থাকা। হ্যামার এবং তার গবেষক-দল জানালেন X ক্রোমোজমের একদম প্রান্তসীমার একটি এলাকা – যাকে Xq28 হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এটাই সমকামী প্রবণতা তৈরির জন্য দায়ী। হ্যামার ৪০ জন সমকামী ভাতৃযুগলের উপর পরীক্ষা করে দেখলেন তাদের মধ্যে ৩৩ টি যুগলের মধ্যে এই Xq28 মার্কারের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। ৭ টিতে পাওয়া যায় নি (বিষমকামীদের ক্ষেত্রে এই মার্কারটি ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত থাকে)। বলা হল যদিও নমুনাক্ষেত্র খুব একটা বড় ছিলো না, তদুপরি ৪০ জনের মধ্যে ৩৩ জনে মার্কার খুঁজে পাওয়াটা আসলেই ‘স্ট্যাটিস্টিকালি সিগনিফিকেন্ট’ । এইটাই হল ডিনহ্যামারের সমকামিতা নিয়ে মাইলফলক গবেষনার সারসংক্ষেপ। তার পরীক্ষায় পাওয়া এই Xq28 মার্কারটি ‘গে জিন’ হিসেবে ‘প্রচারের আলোয় উঠে আসে। আর অনেকেই ডিন হ্যামারের কাজকে এভাবে ব্যাখ্যা করে দিলেন যে, ‘ক্রোমোজমের Xq28 এলাকায় একটি জিন পাওয়া গেছে যা সমকামিতাকে ত্বরান্বিত করে’।

marker_percentage

xq28

চিত্রঃ ডিন হ্যামারের হ্যামার ৪০ জন সমকামী ভাতৃযুগলের উপর পরীক্ষা করে X ক্রোমোজমের একদম প্রান্তসীমার একটি এলাকা – যাকে Xq28 হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সমকামী প্রবণতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।  (ছবিতে ক্লিক করে বড় করে দেখুন)

কিন্তু ব্যাপারটি মোটেই এত সহজ সরল নয়। এই ফলাফল খুব নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণের দাবী রাখে। প্রথম কথা হল ৪০ টি যুগলের মধ্যে ৭ টি যুগলে এই Xq28 মার্কারটি পাওয়া যায়নি। সমকামিতার প্রবৃত্তি তৈরিতে যদি Xq28 মার্কার থাকা ‘অত্যাবশকীয় নিয়ামক’ হতো, তাহলে ৪০ টি যুগলের স্যাম্পলের সবগুলোতেই এটি পাওয়া যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেটা হয়নি। যদি ৪০টি স্যাম্পলের মধ্যে মোটামুটি ২০টিতে পাওয়া যেত, আর বাকি ২০ টিতে না পাওয়া যেত, তবে আমরা বলতে পারতাম সমকামিতার প্রবৃত্তির সাথে এই মার্কারের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেটাও হয়নি। মার্কার পাওয়া গেছে চার-পঞ্চমাংশ ক্ষেত্রে। ৪০টি স্যাম্পলের মধ্যে ৩৩টিতে মার্কার পাওয়ার ক্ষেত্রটি নিঃসন্দেহে ফলাফলের পারিসাংখ্যিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। ডিন হ্যামার হিসাব করে দেখিয়েছেন শুধুমাত্র সম্ভাবনার নিরিখে হিসেব করলে এমনি এমনি (নির্বিচারে) এটা ঘটার সম্ভাবনা ২০০ ভাগের মধ্যে ১ ভাগেরও কম। সে হিসেবে জেনেটিক প্রভাব থাকার প্রবণতাটাকে অস্বীকার করা হয়তো যাচ্ছে না, কিন্তু এটা কখনোই শেষ কথা বলার নিশ্চয়তাও দিয়ে দিচ্ছে না। মোটা দাগে বললে, যেহেতু যমজ ভাতৃযুগলের দুজনই সব সময় সমকামী ভাবাপন্ন হয় না, সেহেতু মার্কার থাকলেই সমকামী হবে – এটা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে, কোন মার্কার না থাকা সত্ত্বেও ৭ টি ভাতৃযুগলে সমকামী প্রভাব পাওয়া গেছে। তার মানে, মার্কারের সাথে কিংবা জিনের সাথে সমকামী প্রবৃত্তির সরাসরি সম্পর্ক শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাচ্ছে না।

আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই মার্কারের সাথে জেনেটিক একটা প্রভাব আছেই, তবুও সেটি একটিমাত্র জিনের সাথে কখনোই নয়। ডিন হ্যামার নিজেই সে কথা বলেছেন এভাবে –

‘কোন একটি জিনকে (এ পরীক্ষায়) পৃথক করা যায়নি। পরীক্ষার মাধ্যমে যা করা হয়েছে তা হল – ক্রোমোজমের একটি অংশ সনাক্ত করা, যে অংশটি দৈর্ঘ্যে চার মিলিয়ন বেস যুগলের সমান। এই অংশটি সমগ্র মানব জিনোমের শতকরা ০.২ ভাগেরও ছোট, কিন্তু তারপরেও এই অংশটিতে অবলীলায় কয়েকশত জিন এঁটে যেতে পারে। এই এলাকায় নিয়ামক জিনটি খুঁজে বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতই। সূঁচ পেতে হলে হয় আমাদের হয় আরো অনেক বেশী পরিবার দরকার হবে, অথবা সম্ভ্যাব্য সকল এলাকার ডি.এন.এ-র অনুক্রমের সম্পূর্ণ তথ্য জানা চাই’।

হ্যামার নিজে ১৯৯৫ সালে পরীক্ষাটি পুনর্বার পরিচালনা করেন হু, পাত্তাউচি এবং অন্যান্যদের সাথে মিলে। এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয় ৩২ টি স্যাম্পল নিয়ে, এবং এর মধ্যে ২২ টি ক্ষেত্রে তিনি আগের পরীক্ষার মতই Xq28 মার্কার খুঁজে পেলেন । অর্থাৎ, শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ ক্ষেত্রে তিনি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারলেন যে, মার্কারের সাথে সমকামিতার একটা প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক আছে। এ ছাড়া স্যান্ডার এবং প্রমুখের ১৯৯৮ সালের গবেষনায়ও ৫৪টি স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করা হয়, এবং এর মধ্যে শতকরা ৬৬ ভাগ ক্ষেত্রে সমকামিতার সাথে Xq28 মার্কারের সম্পর্ক পাওয়া যায় ।

১৯৯৯ সালে ক্যানাডায় জর্জ রাইসের নেতৃত্বে গবেষকের একটি দল ডিন হ্যামারের পরীক্ষাটিই করার চেষ্টা করলেন নমুনা ক্ষেত্র আরো বাড়িয়ে দিয়ে। এই পরীক্ষায় সমকামী ভাতৃযুগল সংগ্রহ করার জন্য কানাডার গে ম্যাগাজিন Xtraতে বিশাল বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, শেষ পর্যন্ত ৪৬ টি যুগল নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। এই যুগলগুলো নির্বাচিত হয় ‘সমকামী সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী’ (gay interviewer) দের মাধ্যমে।
এই পরীক্ষায় ৪৬ টি যুগলের মধ্যে মাত্র ২০টি যুগলে মার্কার পাওয়া গেল , পারিসাংখ্যিক হিসেবে যা অর্ধেকেরও কম। যদি সমকামিতার সাথে মার্কারের নিশ্চিত সম্পর্ক থাকতো তবে ৪৬টির মধ্যে ৪৬টিতেই মার্কার পাওয়া যেত। তা তো হয়ইনি, বরং যদি হ্যামারের মত ‘স্ট্যাটিস্টিকালি সিগনিফিকেন্ট’ ৬৮% ফলাফলেরও পুনরাবৃত্তির কথা বিবেচনা করি, তবে মার্কার পাওয়া যাওয়ার কথা ছিলো অন্তত ৩২ টি। যদি এলোপাথাড়ি ভাবে ঘটা সম্ভাবনার হার শতকরা পঞ্চাশভাগের কথাও চিন্তা করি, তাহলেও মার্কারের সংখ্যা আসা উচিৎ ছিলো ২৩টি। কিন্তু ২০টি মাত্র মার্কার পাওয়াকে কোনভাবেই কোন ধরণের সম্পর্কে ফেলা যায় না। কাজেই অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন এই পরীক্ষাটি Xq28 মার্কারের সাথে ‘গে জিন’ পাওয়ার আগের দাবীগুলোকে ভুল প্রমাণ করে দেয় । ক্যানাডিয়ান গবেষকেরা তার ফলাফল সম্বন্ধে উপসংহার টেনে বলেন,

আমাদের ফলাফল হ্যামারের মূল পরীক্ষার ফলের সাথে এত পা্থ্ক্য কেন তৈরি করলো তা পরিস্কার নয়। … সে যাই হোক, আমাদের এই পরীক্ষার উপাত্ত যৌনপ্রবৃত্তির উপর Xq28 এলাকায় অবস্থিত একটি জিনের প্রভাব থাকার দাবীকে সমর্থন করে না। … (যদিও) এই ফলাফল জিনোমের অন্য কোন জায়গায় সমকামিতার উপর জিনের প্রভাবকে বাতিল করে দেয় না।

এই ‘গে জিন’ পাওয়ার সাম্প্রতিক এই পরীক্ষাগত ব্যর্থতা অবশ্যই একটি ময়নাতদন্ত দাবী করে। সারা মিডিয়া জুড়ে ‘গে জিন’ নিয়ে এত হৈ চৈ হল, অথচ দুইটি বড় পরীক্ষায় দুই রকম ফলাফল বেরিয়ে এলো কেন? তবে কি হ্যামার পরীক্ষায় কোন বড় ভুল করেছিলেন, কিংবা ভাল ফলাফল পেতে ডেটা পরিবর্তন করেছিলেন? নাকি ক্যানাডিয়ান গবেষকেরা সমকামী যুগল নির্বাচনের সময় সনাক্তকরণে ভুল করেছিলেন? এই শেষ বিচারের ফয়সলা এখনো হয়নি। হ্যামার অবশ্য ক্যানাডিয়ীয় গবেষকদের ফলাফল প্রত্যাখান করেছেন এই বলে –

‘তারা (ক্যানাডীয় গবেষকেরা) প্রথমেই ধরে নিয়েছিলেন গে জিন বলে কিছু নেই, এবং তাদের পরীক্ষা ছিলো পক্ষপাত দুষ্ট, কারণ পরীক্ষকের একজন প্রথম থেকেই ‘গে জিন বলে কিছু নেই’ – সেটা প্রমাণেই তৎপর ছিলেন। তাদের সেই (সমকামবিদ্বেষী) মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে তাদের পরীক্ষায়’।

তবে হ্যামার যাই বলুক না কেন গে-জিন নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে সাধারণ মানুষ এবং নিরপেক্ষ গবেষকদের কাছে। তাদের কাছে বিষয়টি এখনো ‘অমীমাংসিত মামলা’ই।
তবে ‘অমীমাংসিত’ বলে ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। এ সংক্রান্ত গবেষণা কিন্তু থেমে নেই। জিনের পথ ধরে সমাধানের পথ খুঁজতে এবারে এগিয়ে এসেছে এপিজেনেটিক্স । এই এপিজেনেটিক্স উপরের সমস্যার একটা আকর্ষণীয় সমাধান হাজির করছে, যা ক্রমশঃ বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তারা দেখেছেন, জিন কেবল একা একা কাজ করতে পারে না, কাজ করে পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের মিথস্ক্রিয়ায়। বৈদ্যুতিক বাতির সুইচের যেমন টার্ণ অন বা অফ করা যায়, ঠিক তেমনি পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের প্রভাবে জিনের সক্রিয়করণ (activation) বা নিষ্ক্রিয়করণ (deactivation) ঘটে । বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন মিথাইলেশন। দেখা গেছে আমাদের চারপাশের বহু কিছুই -পরিবেশ, খাদ্যাভাস, পানীয় বা ধূমপানে আসক্তি, মানসিক পীড়নসহ বহুকিছুতেই এই প্রক্রিয়াটি প্রভাবিত হয়। এই মিথাইলেশন হয় বলেই সদৃশ যমজ ভাতৃযুগলে জেনেটিক কোডে শতভাগ মিল থাকলেও তাদের আচরণে, মন মানসিকতায় কিংবা কাজকর্মে বিস্তর পার্থক্য থাকে অনেক সময়ই। মিথাইলেশনের প্রভাবে জেনেটিক কোডের একাংশ বা একাধিক অংশ টার্ণ অফ হয়ে যেতে পারে। কাজেই একই জেনেটিক কোড থাকা সত্ত্বেও জেনেটিক সুইচের টার্ণ অন বা অফের কারণে একভাই বিষমকামী, আরেকভাই হয়ত সমকামী ভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। এ শুধু তত্ত্ব কথা নয়, এই ধারণার স্বপক্ষে কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেছে সভেন বকল্যান্ডের গবেষণায়। তিনি যমজ ভাইয়ের ঠিক কোন জায়গায় জিন টার্ণ অন বা অফের কারণে প্রবৃত্তির পরিবর্তন ঘটে তার হদিস এখনো না পেলেও সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, সমকামী ছেলের জন্ম দেয়া মায়ের এক্স ক্রোমোজমের সক্রিয়তা অন্য মায়েদের চেয়ে ভিন্ন হয়।

কিন্তু কিভাবে একটি জিন পরিবেশের প্রভাবে সক্রিয় বা অক্রিয় হয়ে যায়? একটি ভাল উদাহরণ হতে পারে স্ট্রেস হরমোন করটিসোল। ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কর্টিসোল স্থায়ীভাবে জিনের একাংশকে নিষ্ক্রিয় (turn off) করে দিতে পারে, এবং এর ফলে ইঁদুরের স্বভাবে পরিবর্তন ঘটে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করেছেন। তারা দেখেছেন, মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে মানবদেহে এই হরমোনের আধিক্য বৃদ্ধি পায়। চাপময় পরিবেশে বেশি দিন কাটালে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায় – ফলে দেহ সহজেই সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হয় সে সময়। কিন্তু ‘ধান ভানতে শীবের গীতের মত’ এই কর্টিসোল নিয়ে পড়ে যাওয়া হল কেন? এই স্ট্রেস হরমোনের সাথে সমকামিতার কি কোন সরাসরি সম্পর্ক আছে? বিজ্ঞানীরা বলেন, থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। জার্মান ডাক্তার গান্টার ডর্নারের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চাপময় পরিবেশে যে সমস্ত মা গর্ভবতী হয়েছিলেন, তাদের সন্তানদের একটা বড় অংশ নাকি সমকামী হিসেবে গড়ে উঠেছিলো ইতিহাসের অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি । এমনকি ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যে সমস্ত ইঁদুরেরা গর্ভের সময় চাপময় পরিবেশে দিন কাটায়, তাদের সন্তানের মধ্যে পরবর্তীতে সমকামিতার আধিক্য তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। অনেক সময় আবার বিভিন্ন এলার্জিক প্রতিক্রিয়ায় দেহে টেস্টোসটেরোন হরমোনের (পুরুষ হরমোন) প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। যে সমস্ত মায়েরা সারা জীবনে অধিক সংখ্যক সন্তানের জন্ম দেয়, তাদের ক্ষেত্রে শেষের দিককার সন্তানদের জন্মের সময় এ ধরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে জানা গেছে। রে ব্ল্যানচার্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোন পরিবারে বড় ভাই থাকলে তার পরের ভাইদের সমকামী যৌনপ্রবৃত্তি তৈরী করার সম্ভাবনাকে শতকরা ২৮ থেকে ৪৮ ভাগ বাড়িয়ে দেয় । অর্থাৎ, একটি পরিবারে বড় ভাইদের সংখ্যা যত বেশী হবে, তত বেশি হবে পরবর্তী সন্তানের সমকামী হবার সম্ভাবনা (একে জনপ্রিয়ভাবে ‘ওল্ডার ব্রাদার ইফেক্ট’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়)। কারণ দেখা গেছে, যত বেশি সন্তানের জন্ম হয়, তত বেশি মায়ের টেস্টোসটেরোন হরমোনের প্রতি এলার্জিক প্রতিক্রিয়াও বাড়তে থাকে। হরমোন নিয়ে এই সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোন কিছুই আসলে নিশ্চিত নয়। বহু মহিলাই আসলে বিভিন্ন সময়ে চাপযুক্ত পরিবেশে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের সবার সন্তান বড় হয়ে সমকামী হয়। আমার নিজের জন্মও হয়েছিলো একাত্তরের দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে,আমার বাবা যখন দেশের সীমান্তে ছিলেন যুদ্ধরত। এমন পরিস্থিতিতে জন্ম নিয়েও কিন্তু আমি সমকামী হিসেবে বেড়ে উঠিনি। কিংবা আমার জন্মের কারণে কোন ‘ওল্ডার ব্রাদার ইফেক্ট’ আমার ছোট ভাইয়ের উপরও পড়েনি । এমন উদাহরণ চারপাশে অজস্রই আছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় সমকামী সন্তানের জন্মদেয়া মায়েদের নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। তাদের প্রশ্ন করা হয়েছে যে, বিষমকামী সন্তানের জন্ম দেয়ার তুলনায় সমকামী সন্তানের জন্ম দেয়ার সময়টিতে কি তারা অধিক চাপযুক্ত পরিস্থিতিতে ছিলেন কিনা। তাদের মতামত থেকে এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি যে,সমকামী সন্তানের জন্মের সময় কোন চাপময় পরিস্থিতি তারা অতিবাহিত করেছিলেন ।কাজেই মায়ের মানসিক চাপের সাথে সন্তানের সমকামিতার কোন প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আসলে প্রতিষ্ঠিতই হয়নি। এ ছাড়া, গান্টার ডর্নারের মূল পরীক্ষার ‘উদ্দেশ্য’ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন মহলে। গান্টার তার গবেষণাপত্রে সমকামিতাকে ‘মানসিক প্রতিবন্ধিত্ব’ (psychic disability) হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘অদূরভবিষ্যতে সমকামিতার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে’।তার এই মনোভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলেই তুমুল প্রতিবাদ হয়েছে, তার সমকামিতার প্রতি বিদ্বেষমূলক মনমানসিকতাকে ইতিহাসের কলঙ্কজনক ইউজিনিক্সের (eugenics) সাথেও তুলনা করা হয়েছে [10]

 

গে জিন নিয়ে মিডিয়ায় এত ঔতসুক্যই বা কেন?

বৈজ্ঞানিক গবেষণার বাইরেও রাজনৈতিক একটা মতাদর্শগত লড়াই যে চলছে তার প্রভাব কিছুটা হলেও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রগুলোতেও পড়ছে। রক্ষণশীল সমাজের চাপে সাড়া দুনিয়া জুড়েই সমকামীদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে হচ্ছে। এই সমকামী অধিকার কর্মীদের অনেকেই ভাবেন, যদি কখনো প্রমাণ পাওয়া যায় যে সমকামী প্রবণতা জৈবিকভাবে অঙ্কুরিত হয় –সেটা সমকামীদের দাবী আদায়ের জন্য অনেক উপকারে আসবে। কারণ, তারা তখন আরো বলিষ্ঠভাবে মানুষজনকে বোঝাতে পারবেন যে, ‘সমকামীরা জন্মগতভাবেই সমকামীপ্রবণতা নিয়ে জন্মায়’, এতে তাদের কোন ‘দোষ’ নেই। ‘এডভোকেট’ নামে একটি মার্কিন গে এবং লেসবিয়নদের পত্রিকায় এ নিয়ে ১৯৯৬ সালে একটি জরিপ চালান হয়, সেখানকার শতকরা ৬১ ভাগ পাঠক মত দিয়েছিলো যে, ‘যদি সমকামিতার পেছনে কোন জেনেটিক কারণ আছে বলে জানা যায়, সেটা তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে’ ।

তবে এই দলের মধ্যে বিপরীত মতও আছে। যদি সমকামী প্রবণতা ‘জেনেটিক’ বলে প্রমাণিত হয়, তবে একে ‘জেনেটিক রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেবার প্রবণতাও হয়তো বৃদ্ধি পাবে। এ ধরণের ভয় থেকে অনেকে আবার জিনের সাথে সম্পর্ক না পাওয়া গেলেই বরং ভাল বলে মনে করেন। তারা আশঙ্কা করেন আগে ডাক্তারেরা যেভাবে সমকামিতাকে ‘মানসিক ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করে নানা উপায়ে রোগমুক্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছেন, সেরমকম প্রবণতা হয়তো জেনেটিস্টদের মধ্যেও ভবিষ্যতে দেখা যাবে; তারা হয়ত হান্টিংটন ডিজিজ, আলসাইমার্স, মাইগ্রেন, সিকেল সেল এনিমিয়ার মত সমকামিতাকেও জেনেটিক রোগ হিসেবে দেখিয়ে তার চিকিৎসার দাওয়াই তখন বাৎলে দিতে চাইবেন। Xq28 এলাকার ঠিক পাশেই ক্রোমোজমের ভিন্নতার কারণে অকুলার এলবেনিজম এবং মেনকিস ডিজিস নামে দুটি দুর্লভ জেনেটিক রোগ তৈরি হয় বলে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন। সমকামিতাও কি সে ধরণের কোন জেনেটিক রোগ? এর জবাব আমরা খুঁজতে চেষ্টা করবো এ নিয়ে পরবর্তী একটি লেখায়।

______________________________

তথ্যসূত্রঃ

[1] And Tango Makes Three, Peter Parnell  and Justin Richardson, Simon & Schuster Children’s Publishing, April 26, 2005

[2] John Schwartz, Of Gay Sheep, Modern Science and Bad Publicity, NY Times, January 25, 2007

[3] Roselli C, Stadelman H, Reeve R, Bishop C, Stormshak F (2007). “The ovine sexually dimorphic nucleus of the medial preoptic area is organized prenatally by testosterone”. Endocrinology 148 (9): 4450–4457; এছাড়া দেখুন, Faye Flam, The Score: How The Quest For Sex Has Shaped The Modern Man, Avery, 2008

[4] Bruce Bagemihl, Biological Exuberance: Animal Homosexuality and Natural Diversity, Stonewall Inn Editions, 2000

[5] 1500 animal species practice homosexuality, www.news-medical.net/news/2006/10/23/20718.aspx

[6] Joan Roughgarden, Evolution’s Rainbow: Diversity, Gender, and Sexuality in Nature and People, University of California Press, May 17, 2004।

[7] LeVay S (August 1991). “A difference in hypothalamic structure between heterosexual and homosexual men” (PDF). Science (journal) 253 (5023): 1034–7.

[8] Pillard RC, Weinrich JD., Evidence of familial nature of male homosexuality, Arch Gen Psychiatry. 1986 Aug;43(8):808-12.

[9] Hamer DH, Hu S, Magnuson VL, Hu N, Pattatucci AM (July 1993). “A linkage between DNA markers on the X chromosome and male sexual orientation”. Science, 261 (5119): 321–7

[10] Francis Mark Mondimore, A Natural History of Homosexuality, The Johns Hopkins University Press, 1996

Categories
LGBT NEWS NEWS অন্যান্য এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ সমকামীদের অধিকার

বাংলাদেশের প্রথম সমকামী ম্যাগাজিন রূপবান প্রসঙ্গ

সমকামীদের অধিকার নিয়ে ম্যাগাজিন “রূপবান” এর প্রকাশনার যাত্রা শুরুর খবরটি আজকের বেশ কিছু জাতীয় পত্রিকার অন্যতম আলোচিত সংবাদ। নজরকাড়া প্রচ্ছদে ৫৬ পৃষ্ঠার এ ম্যাগাজিনটি রাজধানী ঢাকা থেকে গতকাল প্রকাশিত হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। রূপবানের তরুন সম্পাদক রাসেল আহমেদ বলেন “বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে যেখানে সমকামীরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়, সেখানে সমকামীদের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সমাজে ছড়িয়ে দিতেই এ প্রয়াস”।

বাংলাদেশের লেসবিয়ান, গেই, বাইসেক্সুয়াল ও ট্র্যান্সজেন্ডার (এলজিবিটি) মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এটি বিরাট এক পদক্ষেপ। রাসেল আহমেদ বলেন, আমরা আশা করি এটা সমকামী সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। রূপবান ম্যাগাজিনের সম্পাদকের প্রত্যাশা, সমকামীদের জীবনযাপন পদ্ধতি ও বিভিন্ন দিক নিয়ে ম্যাগাজিনটিতে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, তা মানুষের মধ্যে সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সক্ষম হবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে সমকামী পত্রিকা রূপবান নিষিদ্ধের দাবী উঠেছে। “রূপবান” নামে সমকামী ম্যাগাজিন প্রকাশে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় তাফসীর পরিষদ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলেছেন, “বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম দেশে ইসলামী শরীয়তে হারাম ও নিষিদ্ধ সমলিঙ্গের বিয়েকে বৈধতা দিতে এবং বাংলাদেশের মত পীর-মাশায়েখ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে সমকামকে বৈধ দিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক এদেশে কাজ চালাচ্ছে।”

তিনি বলেন, সমকাম ইসলামে অবৈধ ও হারাম। এটাকে পশ্চিমা বিশ্বে বৈধ মনে করলেও মুসলমানরা কখনো তা সমর্থণ করে না। ইসলামের বিরুদ্ধে নতুনভাবে চক্রান্ত করতে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া হারাম সমকামকে এদেশের মুসলমান সমাজে ছড়িয়ে দিতে যারা এ মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে তাদেরকে এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষ বয়কট করবে।

তিনি সমকামীদের ম্যাগাজিন “রূপবান” নিষিদ্ধ এবং যারা সমকামী হিসেবে পরিচয় দেয় তাদেরকে গ্রেফতার করে শাস্তি দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান। অন্যথায় এ সকল কুলাঙ্গাররা এদেশের যুব সমাজের চরিত্র নষ্ট করে পশ্চিমাদের অশান্তির দাবানল জ্বালিয়ে দিবে বলে বলেন তিনি। আজ বিকেলে জাতীয় তাফসীর পরিষদ বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম উপরোক্ত কথা বলেন। সূত্র – ইসলামিক নিউজ ২৪ ডট নেট।

বাংলাদেশের আইনে সমকামিতাঃ বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশেই সমকামিতাকে বৈধতা দিলেও বাংলাদেশ রয়েছে তার আগের পর্যায়ে। বাংলাদেশের আইন সমকামিতাকে এখনো প্রকৃতি বিরুদ্ধ মনে করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তি প্রদান করে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সাথে প্রকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদন্ডেও দন্ডিত হবেন। এ ধারায় বর্ণিত অপরাধীরূপে গণ্য হবার জন্য যৌন সহবাসের নিমিত্তে অনুপ্রবেশই যথেষ্ট বিবেচিত হবে।

[Section 377. Unnatural offences– Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine. Explanation– Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offence described in this section.]

এখন প্রশ্ন আসতে পারে প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলতে কি বুঝানো হয়েছে? এই আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে – “The unnatural offenses are two: {a} Sodomy and {b} bestiality. Sodomy consists of penetration per anus with another person. Bestiality can be committed either by a male or female human being with an animal.” মূলত এই ধারার অধীনে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মামলাতে পায়ুকাম এবং পশ্বাচারকেই (পশুর সাথে যৌনসঙ্গম) অস্বাভাবিক অপরাধ অর্থাৎ “অর্ডার অব ন্যাচার” পরিপন্থি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে সমকামিতাঃ ২০০১ সালে নেদারল্যান্ড প্রথম সমলিঙ্গের বিয়েকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার পর তাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা (অনেক স্টেট) সহ পৃথিবীর প্রায় ৭০টি সুসভ্য দেশ। ২০১১ সালে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলও সমকামিতার পক্ষে একটি ঐতিহাসিক সনদ পাশ করে। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া সহ পৃথিবীর সেরা মুসলিম দুর্নীতিবাজ দেশগুলোর কোনটিতেই সমকামিতাকে সামান্য বৈধতা দেয়াও হয়নি।

ইসলামের মূল সংবিধান,কোরান ও হাদিসে সমকামিতাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে ও শাস্তি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কুরানে সমকামীদের ‘লুতের লোক’ বলা হয়েছে নবী লুতের ঘটনাকে ভিত্তি করে। নবী মুহম্মদ এর শাস্তি নির্ধারন করে গেছেন মৃত্যুদন্ড। (আবু দাউদ ৩৮:৪৪৪৭,তিরমিযি ১:১৫২)মোহাম্মদের পরে খলিফাদের সময়ে আবু বকর ও উমর কিছু সমকামিকে জীবন্ত দগ্ধ করেছিলেন বলে জানা যায়।

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মহাপ্রলয় সংঘটিত হওয়ার আগে পৃথিবীজুড়ে এমনকি মুসলিম দেশসমুহতেও যেসব নাফরমানী শুরু হবে তার মধ্যে একটি হল এই সমকামিতা। ধর্মগ্রন্থ আল কোরানের বিভিন্ন সুরা-আয়াতে মানুষের সমকামী-প্রবনতার বিরুদ্ধে বিচিত্র সব শাস্তি/গজবের কথা বলা আছে। পাথরবৃষ্টি, ভুমিকম্প, বন্যা………. দিয়ে আল্লা তাৎক্ষনিক ভাবে সমকামীদের মাটিতে পিশে শায়েস্তা করেন, (সুরা ৭:৮০-৮২, ২৬:১৭৩, ২৯:২৮-২৯)।

তবে, মানুষের সমকামিতাকে বৈধতা দানকারী টপ-লিস্টেড চিহ্নিত রাষ্ট্র নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, বেজিয়াম, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ কোন দেশেই পাথর বৃষ্টি বা অনুরুপ কোন শাস্তি কেন আল্লাহার পক্ষে শুরু করা এখনো সম্ভব হয় নি তা ইসলামিক গবেষণার বিষয় হতে পারে।

হিন্দু ধর্মে সমকামিতাঃ হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ গুলোতেও সমকামিতার কিছু অদ্ভুত শাস্তি দেয়া হয়েছে। আবার শাস্তির বিচার করলে দেখা যায় মেয়ে-মেয়ে সমকামিতার শাস্তি পুরুষ-পুরুষ সমকামিতার শাস্তির থেকে বেশী। মনুসংহিতার আইনে উল্লেখ আছে –

‘যদি কোন বয়স্কা নারী অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর (কুমারীর) সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুণ্ডন করে দুটি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’ (Manu Smriti chapter 8, verse 370.)।

যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ছিলো দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত (Manu Smriti chapter 8, verse 369.)। সে তুলনায় পুরুষদের মধ্যে সম্পর্কের শাস্তি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বলা হয়েছে – দু’জন পুরুষ অপ্রকৃতিক কার্যে প্রবৃত্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে (Manu Smriti Chapter 11, Verse 68.) এবং জামা পরে তাকে জলে ডুব দিতে হবে (Manu Smriti Chapter 11, Verse 175.)।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আইন এবং প্রধান দুটি ধর্ম ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে ভয়াবহ ঘৃণা এবং শাস্তির জন্য সমকামীরা নিজেদেরকে কখনোই প্রকাশ করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। এই রকম পরিবেশে রূপবানের মতো একটি সমকামী ম্যাগাজিন বাংলাদেশে প্রকাশ আসলেই সাহসী উদ্যোগ। সাহসী উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারলাম না। আশা করি ম্যাগাজিনটি তাদের প্রকাশনায় নিয়মিত হবে, আর তাদের কথা বলবে আমাদের মতো মানুষদের যারা তাদের সম্পর্কে আসলেই না জেনে ভ্রান্ত ধারণা মনে পোষণ করে থাকি।

Source

Categories
LGBT NEWS NEWS অন্যান্য এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ সমকামীদের অধিকার

The LGBT film highlights from 2014

It was a great year for gay men on the big screen, but lesbians and trans people may have to wait until 2015 for more exciting representation.

You and the Night (2013)

You and the Night (2013)

Films about LGBT people are getting seen more widely than ever, with dozens of DVD and VOD releases making queer content available to everyone. Fantastically, a lot of these made it into cinemas across the UK, with films such as Pride and The Imitation Game even enjoying residencies in multiplexes. It was a great year for gay men on the big screen. Sadly, fewer films about lesbians, bisexual and trans people made it onto the big screen, although it looks like they will be better represented next year. But what were the highlights of 2014?

Pride, the moving culture-clash comedy about the gay activists who joined the 1984 miners’ strike in solidarity, was the biggest hit of the year, and looks likely to become a future classic. Its perfect balance of sharp humour and crowd-pleasing celebration made it a hit with audiences and critics, and it romped home with this year’s Queer Palm at Cannes.

Another British hit was Lilting, starring Ben Whishaw as a man grieving his boyfriend’s death, who attempts to connects with the latter’s Cambodian mother, who speaks no English. It was a popular choice to open our newly renamed BFI Flare: London LGBT Film Festival (formerly London Lesbian and Gay Film Festival), and boasts a great performance from Cheng Pei Pei as the stubborn mother.

Pride (2014) and Lilting (2013)

Pride (2014) and Lilting (2013)

2014 was a fine year for French gay cinema. For my money, the best LGBT film of the year was Stranger by the Lake, which was released in cinemas in the spring after a wildly acclaimed run of festivals in 2013 (Alain Guiraudie won the best director award at Cannes). A potent and sexually explicit exploration of danger and desire, this thriller set on a French cruising ground has one of the best endings of a film this year.

A lush biopic of fashion designer Yves Saint Laurent and bawdy comedy Me, Myself and Mum got mixed reviews, although the latter won the César (the French equivalent of the BAFTA) for best film. You and the Night, one of my favourite films of 2014, queer or otherwise, had little fanfare on its UK film release, despite being named one of Cahiers du Cinéma’s best films of the year (in 2013). It is a gorgeous and outrageous film, with a glorious soundtrack from M83, a scene-stealing transgender maid and a woman enthusiastically climaxing over Eric Cantona’s face.

Stranger by the Lake (2013) and You and the Night (2013)

Stranger by the Lake (2013) and You and the Night (2013)

Xavier Dolan kept up his film-a-year pace with Tom at the Farm, an atmospheric and at times scary psychological thriller about a gay man who pays a visit to his recently deceased boyfriend’s family, only to find himself in the middle of a dangerous game of deception. It’s a good film, and a massive step up from Laurence Anyways (2012), his wildly self-indulgent epic about a trans woman adapting to her new life, but for me he’s never quite managed to capture the urgency of his compelling debut I Killed My Mother (2009), made when he was 17.

Dallas Buyers Club won two acting Oscars, for Matthew McConaughey, who gave a great performance and a terrible acceptance speech, and Jared Leto for his portrayal of a trans woman with HIV. While his character, Rayon, is sassy and fun, adding humour to a potentially dark film, the role and his performance have come under criticism, with people demanding to know why a straight cis man, rather than a trans woman, was cast in the role. Others criticised the superficiality of the performance, claiming he played Rayon as if she were a drag queen. In a weak year for supporting roles (Michael Fassbender in 12 Years a Slave was the only serious competitor), Leto’s victory wasn’t a surprise. How that victory will look in a couple of decades is another matter.

Tom at the Farm (2013) and Dallas Buyers Club (2013)

Tom at the Farm (2013) and Dallas Buyers Club (2013)

While some great lesbian films was shown in festivals, disappointingly few of these made it into cinemas, even on the arthouse circuit. There was no equivalent of Blue Is the Warmest Colour (2013) or The Kids Are All Right (2010) this year. The biggest release was Concussion, an intelligent and intriguing tale of a gay woman who becomes a sexy escort following a car accident. Stacie Passon’s film benefits from an excellent lead performance from Robin Weigert and was a hit at Sundance and the BFI Flare Festival. But my favourite lesbian film was more traditional – the melodramatic Reaching for the Moon, about the love affair between American poet Elizabeth Bishop and Brazilian architect Lola de Macedo Soares. Glória Pires is terrific as Soares, and though some found the score overbearing, I thought it added hugely to the complex emotions on display.

Concussion (2013) and Reaching for the Moon (2013)

Concussion (2013) and Reaching for the Moon (2013)

Speaking of awards, two performances of queer men stand a fighting chance come Oscar season. The Imitation Game got strong reviews, and Benedict Cumberbatch deserves at least a nomination for his portrayal of Enigma code-breaker Alan Turing, whose subsequent hounding by the British courts for his homosexuality is one of Britain’s most shameful legal incidents of the 20th century. True, Cumberbatch offers a remixed version of his Sherlock schtick, but it works well. And though he is never specifically identified as gay (does he need to be?), Ralph Fiennes’s campy hero in The Grand Budapest Hotel is one of the most loved cinema characters of the year.

The Imitation Game (2014) and The Grand Budapest Hotel (2013)

The Imitation Game (2014) and The Grand Budapest Hotel (2013)

Some films got a very brief cinema release. In the case of Cupcakes, an Israeli comedy set around the Eurovision Song Contest, deservedly so. It’s a real step down from talented director Eytan Fox (Yossi, The Bubble). G.B.F., a very funny Mean Girls-esque comedy set in an American high school deserved more attention than it got. Rounding off the year is the excellent Eastern Boys, released this month, in which a gay pickup turns suddenly – and sexily – dangerous. It’s from Robin Campillo, the writer of the Palme d’Or-winning The Class (2008).

The queer prizes at the three major European film festivals went to Pride at Cannes, Les Nuits d’été (a film I have yet to see) at Venice and The Way He Looks at Berlin. The last of these has received very positive reviews ever since, and has been put forward as Brazil’s entry for the best foreign language Oscar. While it’s rare to see the sexuality of a blind protagonist explored on screen, it plays everything a bit too safe for my liking. I might have loved it had I seen it as a teenager, but for me it was a bit bland.

G.B.F. (2013) and The Way He Looks (2014)

G.B.F. (2013) and The Way He Looks (2014)

It was a strong year for LGBT documentaries. I Am Divine, about the Queen of Cult and John Waters icon, was a barrel of fun, and offered new insight into the life of the fierce drag queen. The Case against 8 was a thorough and moving exploration of the battle to overturn Proposition 8, the California legislation banning same-sex marriage in the state. The Circle, a drama-documentary about a pioneering gay organisation in 1940s Zurich which received its UK premiere at Fringe! Queer Art & Film Fest, offered a very moving hidden history up for reappraisal (and was one of the few recent Swiss films to get a UK release).

My favourite documentary of the year was The Punk Singer, about feminist icon Kathleen Hanna, a key figure in the Riot Grrrl movement who fronted Bikini Kill and Le Tigre. I wish it had focused a little more on the LGBT issues explored in her work, but it’s a minor quibble in a warm and moving doc.

I Am Divine (2013) and The Punk Singer (2013)

I Am Divine (2013) and The Punk Singer (2013)

So what can we look forward to in 2015? Lots. The best film I saw at the 2014 London Film Festival was The Duke of Burgundy, directed by Peter Strickland (Berberian Sound Studio), an incredible, sensuous and, best of all, very funny erotic tale involving sapphic S&M, with performances of great wit from Sidse Babett Knudsen and Chiara D’Anna. Two major films about trans characters – one male, one female – also get their UK-wide release: 52 Tuesdays (which closed this year’s BFI Flare: London LGBT Film Festival) and Something Must Break (Ester Martin Bergsmark’s follow-up to 2012’s wonderful She Male Snails).

Three more LGBT highlights to look out for: Love Is Strange (from Keep the Lights On director Ira Sachs), Appropriate Behaviour (the funniest comedy I saw at the LFF) and South Korean thriller A Girl at My Door, with an excellent turn from Cloud Atlas star Bae Doona.

The Duke of Burgundy (2014) and 52 Tuesdays (2013)

The Duke of Burgundy (2014) and 52 Tuesdays (2013)

I also can’t wait to see German werewolf flick Der Samurai, Greek Cannes hit Xenia, new films from Carol Morley, Céline Sciamma and François Ozon, and, of course, what our programmers come up with for the BFI Flare: London LGBT Film Festival in the spring. It looks like 2015 is going to be a great year …

 

Artcle Source

Categories
LGBT NEWS NEWS এলজিবিটি এলজিবিটি সংবাদ সমকামীদের অধিকার

Are you bisexual?

If you’re asking yourself “Am I Bisexual?” then here’s a handy checklist:

 

  1. Thinking about the people you’ve been attracted to, so far in your life, were they all of the same gender?

If you answered “No”, to any or all of the questions in our list above then we feel it’s okay for you to call yourself bisexual. We don’t care how attracted you are to the genders around you – you’re bisexual as soon as you stop being exclusively attracted to only one gender.

That’s it. It really is as easy as that.

How you chose to self-identify is up to you – you can call yourself bi-curious, or pansexual, or biromantic, or omnisexual if you feel more comfortable with those terms (see our article “Is Bisexuality Mandatory?” for more on this).Some people identify as straight and have same-sex attractions. Some identify as gay and have different-sex attractions. How you label yourself is a matter of personal choice, but no matter what you add into the definition of gay, straight, or how you define bicurious or pansexual, the definition of bisexual as a sexuality remains very simple.

“Bisexual” adjective – attracted to more than one gender.

Some people describe their attraction as being to “men and women”. Our “more than one” definition for bisexuality covers this.

Some people see gender as fluid, or as having more options than two. They describe their own pattern of attraction as being to “all genders”. Our “more than one” definition covers this if they want to identify as bisexual.

Many people have attitudes about bisexuals, based around myths and assumptions, and these have been tagged on to the definition of bisexual over the years.

It’s time to strip those off. The greatest tool in awareness is language, and bisexual has a very clear meaning.

Don’t worry about not being a ‘proper’ or ‘true’ bisexual – it’s okay to have a preference or to only be attracted to one gender at a time for parts of your life. The dictionary definition does not say “currently”, or “equally”, or “simultaneously” or “only”, and neither does ours!

This is how we define it: A bisexual is someone who is attracted to more than one gender. You might care about the gender of your partner a lot, a little, or not at all – but their gender doesn’t prevent you from being attracted to them.

That’s all it takes, seriously. Are you bisexual?

 

Article Source